বাদলের দুই খালা ও দুই মামা ঢাকায় থাকে। বাদলের ধারণা ওরা সবাই খুব বড়লোক। এমন ভাবার কারণও আছে। বাদলের বড় ভাইয়ের মোবাইল ফোনে খালাতো ও মামাতো ভাইবোনের জন্মদিনের নানা রঙের ছবি দেখে। তখন তারও মনে হয় যদি কোনো দিন তার জন্মদিন পালন করতে পারত! ওদের জন্মদিনের ছবি দেখলেই বাদল মাকে বলে, মা আমার জন্মদিন পালন করো।
বাদলের কথা শুনে মা হাসে। জন্মদিন কী রে বাপ?
বুঝো না। তাইল ভাইয়া কে জিগাও।
ওর বড় ভাই একদিন বুঝিয়ে দিলে মা বলল, গরিব মানুষের আবার জন্মদিন! দুইডা ভাত খাইয়া বড় অও বাপ।
মায়ের কথা শুনে বাদলের মন খুব খারাপ হয়। ওরা জন্মদিন পালন করতে পারে আমি কেন পারব না? গরিব মানুষের কি জন্মদিন নেই? তারা কি জন্মগ্রহণ করে না?
বাদলের বাবা নেই। বড় ভাইটা স্কুলে পড়ে। বাদলের মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ছোট মামা বাদলের ভাইকে একটা স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে যাতে বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ওরা গ্রামে থাকে। গরিব মানুষ। সেই ফোনে ছবি দেখেই তার একটা জন্মদিন পালন করতে খুব ইচ্ছে হয়। সে জানে মার্চের ৫ তারিখে তার জন্মদিন। বড় ভাই তাকে বলেছে। জন্মদিনে নতুন জামা পরবে। মাথায় মুকুট দেবে। কেক কাটবে। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাবে। মা থাকবে ডান পাশে আর ভাইয়া থাকবে বাম পাশে। সে থাকবে মাঝখানে। তারপর একটা কেক কাটবে।
বাদল প্রতিদিনই এমন ভাবে। মাঝে মাঝে সে একা একা কল্পনায় কেক কাটে আর গান গায়, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
এক রাতে সে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা খুব মধুর। একটা ঝলমলে জামা পরেছে। ভাইয়া একটা মস্ত বড় কেক এনেছে। তারপর ছয়টা মোমবাতি এনেছে।
সন্ধ্যায় জন্মদিনের বিশাল আয়োজন। সে হ্যাপি বার্থ ডে বলে হাত তালি দেয়।
এই সময় মা বলেন, কী রে বাদল, কী কস ঘুমের মধ্যে।
বাদল লজ্জা পেলেও তার সুখের স্মৃতিটুকু মনে মনে রাখে।
কিছুদিন পর বাদলের মায়ের অসুখ হয়। খুব বড় ধরনের অসুখ। তাকে ঢাকায় আনার জন্য বড় মামা বলল। ভাইয়া মা ও বাদলকে নিয়ে রওনা হলো ঢাকা। ওরা থাকবে এক খালার বাসায়। ওখান থেকেই চিকিৎসা করানো হবে।
ওরা যেদিন ঢাকায় এল দুদিন পরই বাদলের জন্মদিন। বাদল বুঝতে পারে না মায়ের অসুখ কী? তার মনে শুধু ঘিরে আছে দুদিন পরই তার জন্মদিন। খালাতো ও মামাতো ভাইবোনরা সবাই ওর জন্মদিনে আসবে। অনুষ্ঠান হবে। কেক কাটবে। মোবাইল ফোনে ছবি তুলে ভাইয়ার ফেসবুকে দেবে। তার এই ভাবনা কোনো মতেই কাটাতে পারছে না।
ঢাকায় এসে সে খুশিতে আটখানা। লাফালাফি করল। একবার সোফায় বসল তো আরেকবার খাটে। আহা, কী নরম! কী যে আরাম! বাদল মনে মনে বলে।
একসময় খালাকে একা পেয়ে বলল, দুদিন পরে আমার জন্মদিন খালা। সবাইকে বলে দাও। সবাই যেন আসে। আমি কেক কাটব। ছবি তুলব।
খালা মনে মনে হাসল। আর আফসোস করে বলল, আহা বেচারা! বাদলকে খুশি রাখার জন্যই বলল, আচ্ছা সবাইকে বলব আসতে।
কেক আনবে না?
হুম।
বাদল আবার লাফাতে লাগল। খুব লাফাল। সে কেন এত লাফাচ্ছে মা বুঝতে পারে না। সে একাই জানে তার আনন্দের কথা।
পরের দিন বাদলের মাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হাসপাতালে গেল। সারা দিন হাসপাতালেই কেটে গেল। এদিকে বাদল তো মনে মনে ধরেই রেখেছে তার জন্মদিন হবে। মনে মনে শুধু দিন গুনছে।
পরের দিন আবার ওরা হাসপাতালে কাটাল।
আজকে বাদলের জন্মদিন। বাদল ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ জানে না। মা-খালারা হাসপাতালে গেল আবার। সারা দিন সেখানে কেটে গেল।
বাদল অপেক্ষা করছে খালা কেক নিয়ে আসবে। আবার অবাকও হচ্ছে। অন্য খালাতো ও মামাতো ভাইবোনরা তো কেউ এল না। তাহলে তারা কি আসবে না?
না। কেউই আসেনি। আর জন্মদিনও হয়নি।
বাদলের লাফালাফি বন্ধ হয়ে গেল। মন খারাপ করে সে বাসার কোনা-কানায় বসে থাকে। অসুখের জন্য মাও খোঁজখবরও নিতে পারে না।
এক সপ্তাহ পর মায়ের চিকিৎসা শেষ হলে ওরা বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। এই এক সপ্তাহ কারও সঙ্গে কথা বলতে বাদলের ইচ্ছে হয়নি।
বলেওনি। মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাখি দেখেছে। আকাশ দেখেছে। মনে মনে বলেছে কেউ এল না।
বাড়িতে যাওয়ার সময় বাদল আগে আগে বের হয়ে গেল। সে কারও সঙ্গে একটি কথাও বলল না।
কলি