তিতলির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। এবার সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। ফলাফলও অনেক ভালো। পরিবারের অনেকেই অনেক নামে ডাকে ওকে। ছোট বোন পিউ তো ওকে ঘুমারু বলেই ডাকে। কারণ ঘুম ওর খুব প্রিয়। প্রিয় বললেও ভুল হবে। তিতলির ঘুমের অসুবিধে হওয়ার কিচ্ছুই নেই। ঘুমানোর জন্য সময় পেলেই হলো। মাথার ওপর ফ্যান আছে কী নেই, মাথার নিচে বালিস আছে কী নেই তার দরকার নেই। অবশ্য এমন হবেই না কেন, তিতলির জন্মদিন যে ১০ মার্চ।
প্রতি মাসে ওদের বাসায় কিশোর আলো (কিআ) পত্রিকা নিয়ে আসে। মার্চ মাসের সংখ্যাটা পড়তে গিয়েই পিউ জানতে পারে ১০ মার্চ হলো ঘুম দিবস। যখনি ঘুম পাগলটাকে মা রুপালী বকা দেয় পিউ বলে,
-- আহা! মা, ওকে বকা দিয়ে কী হবে, ওর জন্ম তো নিদ্রা দিবসে। আর বকা দিও না। মেনেই নাও।
কতদিন বই হাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে তা মা ছাড়া কেউ জানে না। মা রুপালী মেয়েকে বইপোকা বলেই ডাকে। যখনি কেউ কিছু গিফট করার কথা বলে, অমনি বলবে,
-- গিফট লাগবে না, আমার জন্য যা বাজেট করেছো তা আম্মুর হাতে পৌঁছে দাও।
বাধ্য হয়ে সবাই তাই করে। সবাই ঠিক জানে তিতলি এই টাকা দিয়ে কী করবে। সারা বছর বই কিনে তিতলি, যখনি সুযোগ পাবে বই কিনবে। শুধু যে বইমেলা থেকে তা নয়। রাস্তা ঘাটে যেখানেই বইয়ের দোকান পাবে অমনি ওর বই চাই। বই নিয়েই মায়ের কাছে অনেক আবদার করে। মা তিতলিকে কোথাও নিয়ে যাবে। সে রাজি হবে না, তখন শর্ত দিয়ে বলে,
--- যদি বই কিনে দাও তাহলে ঠিক যাব।
রুপালী না দিয়ে পারে না। স্কুলে প্রতি সপ্তাহে বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র থেকে আপু-ভাইয়ারা আসে। সেখান থেকে অনেক বই নিয়ে এসে পড়ে তিতলি। ওর জন্য বইপোকা নামটা একেবারেই ঠিক। প্রায় সময় পড়তে বসলে মা রুপালী বসে বসে মেয়েকে পাহারা দেয়। যখনি দেখে মা একটু ঘুমিয়ে পড়েছে বা রান্না করতে গেছে অমনি পাঠ্যবইয়ের ভেতরে গল্পের বই রেখে পড়া শুরু, দূর থেকে মা দেখে মেয়ে পড়ে। বার্ষিক পরীক্ষার সময় গণিত পরীক্ষার দিনে তার অঙ্ক করতে ইচ্ছে করে না, সে চুপে চুপে সারা রাত গল্পের বই পড়েছে। পরীক্ষার পর তা আবার বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প ও করে।
বই মেলার সময় ইয়া বড় একটা লিস্ট তৈরি করে তিতলি। ছুটির দিনে মাকে নিয়ে চলে যায়। লিস্ট ধরে ধরে বই কিনে। বাসায় এসেই সব বইয়ে তারিখ লিখবে, কার টাকা দিয়ে কোন বই কিনেছে সেটাও লিখে রাখবে।
‘১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, একুশে বই মেলা থেকে বড় মামার পক্ষ থেকে’
বা
‘২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, একুশে বই মেলা থেকে আব্বুর পক্ষ থেকে।’
বইগুলো এনে সেই পুরোনো বেতের শেল্ফে রাখে, কিন্তু বেতের সেল্ফে ধুলাবালি পড়ে বই নষ্ট হয়ে যায়। তিতলির খুব মন খারাপ হয়। পরীক্ষার কিছুদিন আগে মা রুপালী বলে,
-- মা তিতলি, তুমি যদি ভালো ফলাফল করো, তাহলে আমি তোমাকে ইয়া বড় একটা বুক শেল্ফ, মানে লাইব্রেরি কিনে দিব। মায়ের কথা শুনে তিতলির সেই কী আনন্দ।
-- মা, সত্যি তুমি দিবে তো।
-- তুই ভালো ফলাফল করেই দেখ।
পরীক্ষা হলো, যথারীতি ফলাফল বের হলো। তিতলি খুব ভালো করেছে। পরদিন বিকেলে সবাই মিলে বের হয়, বাইরে খাওয়া-দাওয়া করে ফার্নিচারের দোকানে গিয়ে বড় একটা শোকেসের অগ্রিম টাকা দিয়ে আসে। ঠিক সময় শোকেস এসে হাজির। তিতলি আগে থেকেই জায়গা ঠিক করে রাখে। সেই জায়গায় রাখা হয় শোকেসটা। শোকেসের সামনে ওপরে লিখে রাখে, ‘তিতলির লাইব্রেরি’। সন্ধার পর থেকে তিতলির কাজ শুরু হয়, ঘরের কোথায় কোথায় বই আছে সব নিয়ে বসে। মোটা বই, মাঝারি বই আর পাতলা বই আলাদা করে। পিউর গল্পের বই রাখার জন্য আলাদা তাক দিয়ে দেয়। এরপর দুই বোন বসে সব বইতে স্টিকার লাগায়। নাম্বারিং করে। রুপালী এসে বলে,
-- ভারী বইগুলো নিচের তাকে রাখবে। আর দেখতে পাতলা ও হালকা বই উপরের দিকে রাখবে।
তিতলির পছন্দ হলো সায়েন্সফিকশন, হরর, ভৌতিক বই। তার সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই। সব বই আলাদাভাবে সিরিয়াল করে
রেখেছে। সারা রাত দুই বোনে পুরো লাইব্রেরিটা সাজিয়ে নেয় বই দিয়ে। রুপালী সকালে উঠে
দেখে পুরো লাইব্রেরিটা ভরে গেছে একটুও জায়গা খালি নেই।
জাহ্নবী