একজন মানুষ সারা জীবনে ঠিক কতগুলো বই পড়তে পারে? আর যারা মাত্র কিন্ডারগার্টেন শুরু করেছে এবং যাদের বয়স ১২ বছর বা তার কম তাদের পক্ষে ওই বয়সে ঠিক কতগুলো বই পড়া সম্ভব? অবাক করা বিষয় হলো পৃথিবীতে এমন অনেক শিশু-কিশোর আছে যারা কিন্ডারগার্টেন পার হওয়ার আগেই ৩০০ থেকে ১০০০ বই পড়ে ফেলেছে! তেমনই কিছু শিশু-কিশোরের গল্প শোনাচ্ছেন জাজাফী
লানা রেনল্ড ও জুদাহ রেনল্ড
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার অন্তর্গত ব্রুকভিল নামক স্থানে একটি লাইব্রেরি আছে যার নাম রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরি। স্থানীয় মানুষ এই লাইব্রেরির সদস্য। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে শত শত শিশু-কিশোর। সেসব শিশু-কিশোরের অনেকেই এক হাজার বই পড়ে ফেলেছে আবার কারও কারও সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি চলে গেছে। তাদেরই একজন লানা রেনল্ড। সে কিছুদিন আগেই এক হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। লানা যখন খুব ছোট ছিল তখন সে দেখত মা তার পাশে বসে বই পড়ছে। কখনো কখনো মা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বই পড়তেন। সেই থেকে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় লানার। তারপর সে যখন স্কুলে গিয়ে দেখে দেখে পড়া শিখল তখন সে মায়ের পাশে বসে তার উপযোগী বই পড়ত।
লানার পড়া বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বই ‘দ্য নেস্টিং বার্ড’। কারণ সে পাখির ছানা খুব ভালোবাসত। লানার ছোট্ট একটা ভাই আছে। মা যেমন ছোটবেলায় তাকে গল্প পড়ে শুনাত লানা নিজেও পড়তে শেখার পর তার ছোট ভাই জুদাহ রেনল্ডকে পাশে বসিয়ে বই পড়ে শুনাত। এভাবে তার ভাইও বইয়ের প্রতি ভালোবাসায় আটকা পড়ল। ছোটবেলা থেকে লানা যেসব বই পড়েছিল সেগুলোই এখন জুদাহ নিজে পড়ছে। আর সে ইতোমধ্যে ২০০ বই পড়ে ফেলেছে। বয়স যদিও মাত্র ৭ বছর! আর তার প্রিয় বই ‘পিটি দ্য ক্যাট’।
লানার বই পড়ার শুরুটা তার মায়ের হাতে হলেও সেটা গতি পেয়েছিল রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরির বই পড়া কর্মসূচির মাধ্যমে। বাংলাদেশে যেমন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ার কর্মসূচি আছে অনেকটা সেরকম। লানার মা তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে বইপড়া কর্মসূচির বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন। সেই বান্ধবী তার সন্তানদের খুব ছোটবেলা থেকেই ওই লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতেন এবং নিজেও বই পড়তেন। এটা শুনে তিনিও লানাকে ওই লাইব্রেরির সদস্য করেন। লানার মা মাইলিয়া মনে করতেন এই পড়ার অভ্যাস তার ছোট্ট ছেলে মেয়েকে ভবিষ্যতে সফল হতে সহযোগিতা করবে।
বেথেনি ফ্রিটজ
বেথেনি ফ্রিটজ নামের মেয়েটিও বইয়ের পোকা। ইতোমধ্যে এক হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। বেথেনির দাদি আন ফ্রিটজ বলেছেন, ‘বেথেনির বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন থেকে সে লাইব্রেরির গ্রীষ্মকালীন বইপড়া কর্মসূচিতে নাম দিয়েছিল।’ বেথেনিদের বাসায় যে রেফ্রিজারেটর আছে সেটার দরজায় সে একটা চার্ট লাগিয়ে রেখেছিল কবে কখন কোন বই পড়বে। রোজ সে সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে নিয়ম করে বই পড়তে শুরু করেছিল। বেথেনিও লাইব্রেরি খুব ভালোবাসত। বইয়ের রাজ্যে সে আনন্দের সঙ্গে বিচরণ করত। লাইব্রেরি থেকে যখনই যে অফার দিত সে ও তার পরিবার তা লুফে নিত। বেথেনির প্রিয় বইয়ের নামও ‘পিটি দ্য ক্যাট’। বেথেনি বলেছে এই বইটি তার বেশি ভালো লেগেছে কারণ যে বিড়ালটিকে নিয়ে এই বইটি লেখা হয়েছে সে খুব মজার মজার ঘটনা ঘটায়। সেগুলো পড়লে খুব আনন্দ হয়, হাসি পায়।
লাইব্রেরিতে বসে পড়ার পাশাপাশি পছন্দের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ আছে। একবার তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো কোন বইটি তুমি বাড়িতে নিয়ে পড়তে চাও? সে বলেছিল পারলে সবগুলোই বাড়ি নিয়ে পড়তে চায়! বইগুলো কিন্তু খুব বেশি বড় না। ছবিযুক্ত দারুণ সব ফিচার বুক। যেখানে ছবির সঙ্গে সঙ্গে কয়েক লাইন করে গল্পবলা হয়। ফলে খুব দ্রুতই পড়া হয়। বেথেনি ঘুম থেকে উঠে বই পড়ে, নাশতার টেবিলে নাশতা করতে করতে বই পড়ে। নাশতা শেষ হলে বই পড়ে। দুপুরে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়ে আবার ঘুম থেকে উঠেও বই পড়ে। রাতে খাবারের আগে বই পড়ে আবার খাবার শেষেও বই পড়ে। আর ঘুমাতে যাবার আগেও বই পড়ে!
অ্যাবি হলিস
আরেক পড়ুয়ার নাম অ্যাবি হলিস। বয়স এখন মাত্র ছয় বছর। এ বছর সে কিন্ডারগার্টেন পার করবে। ইতোমধ্যে সে রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরির গ্রীষ্মকালীন বই পড়া কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ৯০০ বই পড়ে ফেলেছে। অ্যাবি খরগোশের গল্প পড়তে বেশি ভালোবাসে। তার ইচ্ছা এক হাজার বই পড়া শেষ করে লাইব্রেরি থেকে পুরস্কার নেবে। এই প্রোগ্রামে যারাই এক হাজার বই পড়া শেষ করেছে তাদের লাইব্রেরি থেকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এই এক হাজার বই পড়ার জন্য সময় পাওয়া যায় পুরো এক বছর। অনেকে ভাবতে পারে এই বয়সে এক বছরে এক হাজার বই পড়া কীভাবে সম্ভব? তাদের জন্য একটি তথ্য যুক্ত করেছেন রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। শিশুদের বই পড়ায় উৎসাহ জোগাতে তারা একটি ব্যতিক্রম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। শিশুদের বইগুলো সাধারণত ২০ থেকে ৩০ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হয়। ছবি আর লেখায় বইটি পরিপূর্ণ থাকে। ফলে দেখা যায় একটি বইয়ের শব্দ সংখ্যা ৫০০ থেকে ১০০০-এর কম হয়। ফলে এক বসাতেই পুরো বই পড়া হয়ে যায়। অন্যদিকে কারও যদি কোনো বই খুব ভালো লাগে এবং সে যদি সেই বই বারবার পড়ে তবে প্রতিবার পড়া হিসেবে একটি সংখ্যা কাউন্ট করা হয়। মানে অ্যাবি হলিস তার পছন্দের বইটি যদি ১০০ বার পড়ে থাকে তবে সে ১০০টি বই পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। লাইব্রেরিয়াম স্ট্রম মনে করেন রিপিটেশনের মাধ্যমে শিশুরা যেন বইয়ের বিষয়বস্তু আরও ভালোভাবে জানতে ও শিখতে পারে তাই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জাহ্নবী