সন্ধ্যা গাঢ় হলে, প্রশান্তির বাতাস বয়ে চলে ধানখেত আর নদীর বুক জুড়ে। তখন একটু একটু করে জোছনারাও নেমে আসে। এত জোছনা আকাশ কোথায় পায়, সে এক বিস্ময়। পৃথিবীকে তারা করে তোলে মায়াময়। গাছ, ঘাস আর জোছনায় তখন গভীর বিস্ময়। সেদিকে অপলক তাকিয়ে থাকে ঘুম ভাঙা একদল ঘাসফড়িং। পলক ফেলার ফুরসত যেন নেই। রাত একটু গভীর হলে পরীরা বের হয়। নেমে আসে পৃথিবীর কাছে। রোজ তারা আসে। দেখে মনে হয়, কত কথা বলা বাকি যেন তাদের মায়াময় এই পৃথিবীর কাছে। আজই বলতে হবে সব। আজও এসেছে তারা। এত জোছনা দেখে যেন দিক হারিয়ে ফেলার অবস্থা। কোন দিকে যাবে! সেই কথা ভেবে জোনাকিরা আলো জ্বেলে রাখে। সত্যি কোনো পরী যদি পথ হারিয়েই ফেলে, তাদের কাছেই যেন আসে। এখানে জোছনার আলো আসে না। গভীর বন। কিন্তু তাদের আলো কম নয় জোছনার চেয়ে। আলো জ্বালাবার এই কাণ্ড দেখে, চাঁদ হাসে। বহু দূর থেকে। জোনাকিরা খুব বুঝতে পারে তা। কিন্তু উত্তর করে না।
সেই বাগান হঠাৎ ঝলমল। আলোকিত গভীর বন। একদমই আচানক। কেমন করে হলো? জোনাকিদের বিস্ময়। এমন আলো কে নিয়ে এল, গাছে আর লতায় ভরা এই বনে! শোরগোল পড়ে। জোনাকিদের মাঝে ব্যস্ততা বাড়ে। উদ্যমী তারা, উদ্যোগী হয়। ছোটাছুটি তাদের সারা বনময়। শেষে দেখে ফুটফুটে এক পরী। আলো ভেবে ভুল করেছে তারা। তাদের প্রশ্নের নেই কোনো শেষ। কেমন করে এল, পথ ভুলে এসেছে কি না, সে যদি এক্ষুনি ফিরে যেতে চায়, জোনাকিরা নিয়ে যেতে পারে, দেখিয়ে দিতে পারে পথ। উড়ে যাবে তারা অনেক দূর, জোছনা বিছানো পথে। বলল পরী, এসব কিছুই না। শুধু জোনাকিদের বিস্মিত করতে এসেছে সে। আরও কিছু কারণও আছে অবশ্য।
এলে কেমন করে, এই বনে?
এটি তো কোনো সমস্যাই নয়। তোমরা জ্বালিয়ে রেখেছ এত আলো, আমি তো দেখে বিস্মিত। তাই, যখন খেলছে সবাই, সুযোগ বুঝে চলে এসেছি আমি। বলতে পারো, দল ছুট হয়েছি।
বাহ, বেশ করেছ। খুব ভালো লাগছে আমাদের।
এখানে শুনেছি দোয়েলেরা বাসা বোনে। টুনটুনি আর বুলবুলি গান গায় অবিরাম।
হু, তারা খুব মাতিয়ে রাখে এই বন। সারা রাত স্বপ্নে তারা রচনা করে যত সুর। পরের দিন সেই সুরে মাতোয়ারা করে আমাদের। শুনেছ তাদের গান?
খুব শুনেছি। আমি আরও জানি, রাতে একটি মায়াবী প্যাঁচা জেগে থাকে। সারা রাত পাহারা দেয় এই বন। খুব সতর্ক সারাক্ষণ।
এই কথা শুনে, প্যাঁচা ডেকে ওঠে, হুত হুতম! শিমুল গাছের খোঁড়লের পাশ থেকে। খুব খুশি হয়েছে। তার প্রশংসা করেছে বলে। তার ডাক শুনে জোনাকিরা একসঙ্গে হেসে ওঠে।
জোনাকিরা বলে, তবে কি জানো, তাদেরও খুব মন খারাপ এখন। দোয়েল আর বুলবুলির। গান গায় তবে প্রাণ ভরে নয়। দরদ যেন কমে গেছে ইদানীং।
কেন, ঘটেছে কি বিশেষ কিছু?
জানি না ঠিক। আজ খবর নেব। তবে মনে হয়, সেই যে ছোট্ট খুকি, সে তো আসে না আর। মন খারাপ হয়েছে নাকি তার।
বলো কী তোমরা? আলতা মাখা পায়ে ঘোরাঘুরি করে খুব। নূপুর আছে পায়ে। শোন তবে, খুকির মন ভালো করতে হবে। দোয়েল আর বুলবুলির গানে সুর থাকবে না, এ কখনো হয়!
না, হতে পারে না। আমরাও যাব তার কাছে। ফড়িং আর প্রজাপতিদের সঙ্গে। তোমাকে জানাব কাল।
খ.
ফিরে যায় পরী। যখন বাড়ি যায়, সবাই খুব রাগ হয়। অমন করে নাকি কোথাও চলে যাওয়া তার ঠিক নয়। কাউকে না জানিয়ে উধাও হওয়া। একেবারে ভালো নয়। সবাই তো ভেবেছিল হারিয়ে গেছে সে। পথ ভুল করে। এখন কেউ যদি তাকে নিয়ে না আসে খুব কষ্ট হবে তার। এসব কথায় কোনো জবাব দেয় না সে। শুধু জানায়, হারাবার কথা তো নয়। সে গিয়েছিল ওই গভীর বনে। যেখানে হাজার জোনাকি রোজ খেলা করে। গাছ, ফুল, লতা আর পাখির বিচিত্র সমাবেশ।
কিন্তু বড়রা মানে না সে কথা। খুব কথা ওঠে তখন। বলে তারা, অত সাহস ভালো না। দলছুট পরী খুব চুপ থাকে। কী বলছে সবাই, শুনে যায় শুধু। তার মনে শুধু খুকির কথা। মন খারাপ হয়েছে তার। খুব অস্থির থাকে মন। খুকির নূপুরের শব্দ শোনেনি তো সেও কিছুদিন। কাল দেখা করতেই হবে।
দেখা হয়। গিয়ে দেখে সবাই হাজির সেখানে। প্রজাপতি আর ফড়িং তার সঙ্গেই ছিল। আগে থেকে বসে আছে জোনাকি আর কিছু পাখি। সবাই নাকি বুঝতে পেরেছিল আজ আসবে পরী। খুকি জানায় বাবা তার গাছ ফেলেছে কেটে। অনেক ফুল ধরত সে গাছে। বাবা ভেবেছিল আগাছা সেটি। কোনো কথা হয় এটি? শেষে অভিমান করে কদিন কথা বলেনি কারো সঙ্গে। বের হয়নি কোথাও।
পরীটি জানায়, তুমি বোধহয় জানো না, তোমার ওই গাছটি কেটেছিল সে না বুঝে। অন্য গাছ কাটতে গিয়ে কেটে ফেলেছিল।
বাবা বলেনি তো সেসব কিছু।
তুমিই তো গোসা করলে খুব। ওখানে একবার গিয়েই দেখ না! গাছ তোমার লাগানোও হয়ে গেছে।
বাহ, তাই নাকি?
তাহলে শোনো। সেই ফুলের আরও একটি গাছ আছে। তোমাদের বাড়ির ওই পাশে। এখনো ধরেনি ফুল। তবে ধরবে খুব তাড়াতাড়ি।
গ.
এরপর একদিন দুদিন যায়। ভাবনা আর নির্ভাবনায়। খুকি রোজ গিয়ে দাঁড়ায় সেই গাছের কাছে। সকাল বেলা একদিন তার ঘুম ভেঙে যায়। প্রজাপতি, ফড়িং আর মৌমাছিদের কোলাহলে। কত কথা, কত ফুর্তি তাদের! বলে শেষ করা কঠিন। ফড়িংরা তাকে ডেকে নিয়ে যায়, মৌমাছিদের গুঞ্জনে। খুব অবাক লাগে তার। ফুলে ভরে গেছে তার সব গাছ। সন্ধ্যা হলেই আসবে জোনাকিরা। খবর পাঠিয়েছে তারা। কিন্তু সারা রাত জেগে পাহারা দিয়েও প্যাঁচাটি এখনো একেবারে জেগে আছে। অপেক্ষা করছিল সে, দেখবে সকালে, খুকি কেমন করে। খুশিতে সে ডেকে ওঠে আবার, ভূত ভুতুম! তার ডাক শুনে এবার হাসির রোল পড়ে যায়, পরীদের জলসা ঘরে। গাছেরা তখন আরও নিবিড় হয় আরও ঘন সবুজে। দল ছুট পরী একাকী এক পাশে দাঁড়ায়, খুকির নূপুরের ধ্বনি শুনতে পেয়ে। আলতা মাখা পায়ে ছোটাছুটি করছে খুকি। দুনিয়াময় ছন্দ ভরিয়ে। আজ জোছনা নামবে রাতে। নিশ্চিত এই পৃথিবী হবে আরও মায়াময়।
লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা