এখন পুরো বর্ষাকাল। হাওরের চারপাশে পানি টইটম্বুর। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। হাওরের মানুষের চলাফেরা নিয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে ‘শুকনায় পাও, বর্ষায় নাও’ অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে যদি আপনি হাওরাঞ্চলের মেঠোপথে চলতে চান অবশ্যই আপনাকে হেঁটে চলাচল করতে হবে এবং বর্ষাকালে পানির ওপর দিয়ে নৌকা দিয়ে পারাপার করতে হবে। অর্থাৎ বর্ষাকালে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকা। যাদের বর্ষাকালের বাহন এই নৌকা নেই এখন নৌকা কেনার জন্য তাদের ভরসা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মধ্যনগর বাজার কাচারি ঘাটের শতবর্ষী নৌকার হাট।
সপ্তাহে প্রতি শনিবার এ নৌকার হাট বসে।
এ বাজারে দাম ও আকারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের নৌকা পাওয়া যায়। এগুলো হলো খিলুয়া, চডানাও, খুশি, সড়ঙ্গা, চাচতলী ও বারকি। এ সবের মধ্যে হাতে বাওয়া নৌকা যেমন রয়েছে, তেমনি ইঞ্জিনচালিত নৌকাও। ছোট নৌকাগুলো তিন হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়, মাঝারি নৌকা ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় এবং বড় নৌকা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নৌকা কেনাবেচা হয় এ হাটে। প্রতি হাটে দুই থেকে তিন শতাধিক নৌকা বিক্রি হয়।
এসব নৌকা হাওরাঞ্চলের মানুষ যাত্রী পরিবহন, মাছ ধরা ও গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহসহ নানা কাজে ব্যবহার করে থাকেন।
এ হাটে বেশির ভাগ নৌকা নিয়ে আসেন পাশ্ববর্তী তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গ্রাম উত্তর নোয়াগাঁওয়ের কারিগররা। নৌকা কেনাবেচা করতে হাটে আসেন উপজেলার সদর, চামরদানী ও বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের লোকজন। তবে পার্শ্ববর্তী ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, কলমাকান্দা থেকেও নৌকা কেনাবেচার জন্য হাটে আসেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্ভবত ১৯২০ অথবা ১৯২২ সালের দিকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় যখন এই এলাকার মানুষের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে মধ্যনগর বাজারে তিন একর জায়গাজুড়ে একটি পুকুর খনন করেন, তখন এ পুকুরের মাটি চারপাশে ফেলে ভরাট করে মধ্যনগর বাজার বসানো হয়। ঠিক তখন থেকেই মধ্যনগর বাজারে এ নৌকার হাট বসতে থাকে। বর্তমানে এ নৌকার হাটের বয়স শতবর্ষের ওপরে।
হাটে নৌকা কিনতে আসা ক্রেতা পঞ্চাশোর্ধ্ব তৈয়ব আলী বলেন, ‘আমি প্রতিবছর এ হাটে নৌকা কিনতে আসি। মাছ ধরার জন্য সাড়ে ৭ হাজার টাকায় একটি নৌকা কিনেছি। নৌকার দামদর নাগালের ভিতরেই আছে।’
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর নোয়াগাঁও থেকে নৌকা বিক্রি করতে আসা কয়েকজন কারিগর বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম এলেই আমরা নৌকা তৈরি করে ব্যস্ত সময় পার করি। প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারে হাটের দিন এসব নৌকা বিক্রি করি। আমরা বেশির ভাগ মাছ ধরার নৌকা তৈরি করি। একেকটি নৌকা একেক দামে বিক্রি করা হয়।’
হাওর গবেষক ও লেখক সজল কান্তি সরকার বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে পণ্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থা আদিকাল থেকে প্রচলিত। আধুনিক অর্থনীতিতে একেকটি পণ্যই একেকটি বাজারব্যবস্থা। মধ্যনগর বাজারের নৌকার হাটটি বেশ পুরোনো। এ অঞ্চলের চাহিদা অনুযায়ী সবধরনের নৌকা পাওয়া যায় মধ্যনগর বাজারে।’