দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিতে সিদ্ধহস্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের অনেক সাব-রেজিস্ট্রার। বেশ কিছু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ছেয়ে আছে নানা রকম জঞ্জাল। সেবা গ্রহীতাকে জিম্মি করে অবৈধভাবে অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি, নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ রয়েছে নানা অপকর্ম। শুধু নিবন্ধন অধিদপ্তরই নয়, সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সাধারণ মানুষকে সেবাবঞ্চিত করে অবৈধভাবে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ভূমি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত কোনো কোনো সাব-রেজিস্ট্রার। এমনই তথ্য উঠে এসেছে খবরের কাগজ পত্রিকায়। ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগে অন্তত ১০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা ও চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয়কে মাঝেমধ্যে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। পাশাপাশি দুদক ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে মামলা করে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদের ক্ষেত্রে দুদকের মামলায় চার্জশিটের ভিত্তিতে আদালতে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হলে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে মন্ত্রণালয়।
এ বছর অন্তত ২৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয় ও দুদক। এর মধ্যে মন্ত্রণালয় ১৫ জনের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে দুদকের মামলা ও চার্জশিটভুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়। এ ব্যাপারে নিবন্ধন অধিদপ্তর জানিয়েছে, আদালতে চূড়ান্তভাবে অভিযুক্ত বা সাজা না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। পরে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় অনেকে আবার পুনর্বহাল হন। গত জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. আব্দুস ছালাম আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুদক বা অন্য কেউ কিংবা কোনো সংস্থা মামলা করলেও সেই মামলায় আদালতে চূড়ান্তভাবে শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কারণ সাব-রেজিস্ট্রার বা সরকারি কর্মকর্তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে ওই সব মামলা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকে। তাই আদালতের চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।’
অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রাররা যেভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। গাজীপুরের তিনজন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭২ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। যার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। ময়মনসিংহের ভালুকায় জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ৯ কোটি টাকার জমি আত্মসাতের মামলায় সাব-রেজিস্ট্রারকে আসামি করা হয়েছে।
অবৈধ উপায়ে প্রায় ৮০ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার মো. সিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে দুদক থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষকে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, কোনো খবর রাখা হয় না। দুদকের যতটা দায়িত্ব পালন করা উচিত, ততটাই করে থাকে।’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় যদি গলদ থাকে তাহলে সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশ করেই দুর্নীতিতে লিপ্ত হবে। এক কথায় সরকারকে সেবা প্রদানকারীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে দুর্নীতি চলতেই থাকবে। তাই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।