নির্বাচনি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদকে ঘিরে নানা বাধাবিপত্তি আবর্তিত হয়েছিল। আদৌ নির্বাচন হবে কি না, এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছিল। দেশে এবং বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। এক পক্ষ বলেছে, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না এলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। আরেক পক্ষ বলেছে, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না এলেও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হোক। সব মিলিয়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান এ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল।
সারা দেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুধু নওগাঁ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মৃত্যুতে এ আসনের যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে ইসি। গতকাল রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটাররা তাদের পছন্দমতো প্রার্থীদের ভোট প্রদান করেছেন।
নির্বাচনের দিনেও বিএনপিসহ নিবন্ধিত ১৬ দল ভোট বর্জন করে হরতাল কর্মসূচি পালন করে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ‘গ্রহণযোগ্যতা’। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশও এ নির্বাচন যাতে গ্রহণযোগ্য হয়, সে বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল। গ্রহণযোগ্যতার চ্যালেঞ্জ নিয়েই গতকাল নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গ্রহণ শেষে ১ ঘণ্টা বিরতির পর ভোট গণনা শুরু হয়।
এবারের নির্বাচনে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছে। খবরের কাগজের সরেজমিনের তথ্যমতে, কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। একটা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন বলে অনেক ভোটারকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে তুমুল প্রতিযোগিতা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে।
পাল্টা অভিযোগও কম আসেনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি, প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সহিংসতার খবরও পাওয়া গেছে।
মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে নৌকার প্রার্থীর একজন সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছেন, সারা দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে প্রায় ভোট পড়েছে ৪০ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। তবে আমি এটা বলব না- খুব ভালো করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি। নির্বাচন কমিশন আশা করছে, এই নির্বাচন দেশে এবং বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বাইরে, তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চায়নি। তারা চেয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু এটা অনেক আগেই সংবিধান থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল সংবিধানের বাইরে নির্বাচনে যাবে না। বিরোধী দলকে আনার ব্যাপারে সরকার আরও উদ্যোগী হলে ভালো হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন হতেই হবে। নির্বাচন কমিশনের এটা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্বাচন হয়েছে। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা এখানেই। এ যুক্তিতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, এটা ঠিক না। কোনো কোনো দেশ বিরোধিতা করে তাদের নিজেদের নানাবিধ সমীকরণের কারণে। নির্বাচন হয়ে গেলে সরকার গঠন করে তারা নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতা ও দক্ষতা-অভিজ্ঞতা দিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে পারবে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। নৌকার জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে ৩০ দেশের ১১৭ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন (অ্যাক্রেডিটেশন) পেয়েছেন। এবং তারা পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, ‘কোথাও কোনো অনিয়মের তথ্য পাননি। অনেক দেশের চেয়ে ভালো ভোট হয়েছে।’
দেশের কল্যাণে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য এ নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথ মসৃণ ও গতিশীল হবে। গণতন্ত্রের বিজয় সুনিশ্চিত হবে, এটাই প্রত্যাশা।