এ দেশে যে খাবার অপচয় হয় তা দিয়ে কমপক্ষে আরও ১ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করা যায় বছরে। খাবারগুলো সরাসরি বর্জ্য হিসেবে ভাগাড়ে ফেলা হয়। বিশেষ করে বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ, অনুষ্ঠানাদিতে এসব খাবারের অপচয় দেখলে না খেয়ে থাকা হতভাগ্য মানুষের কথাই ভেসে ওঠে। সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে ১ কোটি মানুষের খাবারের সংস্থান হতো অনায়াসেই। দেশে শুধু খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন ও ব্যবস্থাপনায় উদাসীনতা এবং অদক্ষতার কারণে বছরে ১ কোটি মেট্রিক টনের বেশি খাদ্য অপচয় হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এ হিসাব ধরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অপচয় রোধ করা গেলে কমপক্ষে আরও ১ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করা যাবে বছরে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮২ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ এক কেজি। সে হিসাবে যদি ১ কোটি মেট্রিক টন খাবারও অপচয় হয়ে থাকে, তবে বলা যায় ওই অপচয় রোধ করা গেলে হয়তো ১ কোটি মানুষের খাবারের সংস্থান করা যেত। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এখনো নিজস্ব কোনো কার্যক্রম নেই অপচয় ও নষ্ট রোধে। তবে গবেষণা বিভাগ কিছুটা তৎপর হয়েছে। জানা মতে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো একটি জরিপ কার্যক্রম শুরু করেছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসব দিকে মানুষের তেমন নজর নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে ফল উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি করা হয়। সেখানকার সাধারণ ভোক্তারাও এসব ক্ষেত্রে সচেতন। দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে সামান্য যেটুকু পদ্ধতি চালু হয়েছে তারও গতি খুব ধীর। দেশে ফলসহ উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের উপায় নিয়ে এবারই প্রথম একটি বড় গবেষণা হয়েছে। এখন ফলাফল পর্যালোচনা চলছে। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ফল ও সবজি ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট ও অপচয় হয়।
অ্যাকশন এইড পরিচালিত ‘ঢাকাবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস ও প্রবণতা’বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় হয়। এর পরই রয়েছে রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে।
জাতিসংঘের ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স অনুসারে, বাংলাদেশে বছরে ১ কোটি ৬ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য অপচয় হয়। সেখানে মাথাপিছু অপচয় হয় বছরে ৬৫ কেজি খাদ্য। যার অধিকাংশই অপচয় হয় রাজধানী ঢাকায়। অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক গবেষণার ফলাফল অনুসারে দেশের উচ্চ আয়ের পরীক্ষাতে প্রতি মাসে মাথাপিছু ২৬ কেজি খাবার অপচয় হয় প্রক্রিয়া করার সময়। এর ৫.৫ শতাংশ অসচেতনতা ও বিলাসীতার কারণে গৃহস্থালি পর্যায়ে অপচয় হয়। খাদ্য সংগ্রহ ও প্রস্তুতি পর্যায়ে ৩ শতাংশ, পরিবেশন ও প্লেট পর্যায়ে ২.৫ শতাংশ অপচয় হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বে নষ্ট ও অপচয় হওয়া খাদ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশই ফল ও সবজিজাতীয় খাদ্য। ফল নিরাপদ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করতে না পারা, সংগ্রহের সময় জমিতে পড়ে থাকা, সংগ্রহের পর সংরক্ষণের জন্য নেওয়া কিংবা বাজার পর্যায়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগত কারণে পচে নষ্ট হয়। এ ছাড়া এখনো দেশে আমসহ অন্যান্য ফল প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সংরক্ষণস্থল ও তাপমাত্রাও সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। দুধ সংগ্রহের পরে যদি ২০ মিনিট দিনের আলোতে কিংবা উজ্জ্বল বাতির আলোতে থাকে, তবে তার পুষ্টিগুণ ২৮ শতাংশ কমে যায়। দুধ যত সময় বেশি আলোতে থাকবে ততই তার পুষ্টিগুণ হারাবে। বাংলাদেশে দুধ সংরক্ষণের পদ্ধতিটিও তেমন উন্নত নয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ফল ও সবজি ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট ও অপচয় হয়। সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে খাদ্যদ্রব্য পচে নষ্ট হয়ে যায়। তাপমাত্রাও সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। বিশ্বে নষ্ট অপচয় হওয়া খাদ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ ফল ও সবজিজাতীয় খাদ্য। এর পরই ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, ৩০ শতাংশ বীজ জাতীয় খাদ্য এবং ২০ শতাংশ করে মাংসও শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য।’
খাদ্যের অপচয় রোধ করা জরুরি। বিশেষ প্রক্রিয়াই খাদ্য ও সফল উৎপাদিত সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। খাদ্যমান ও পুষ্টিমান সম্পর্কে জনসচেতনতার পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনাও জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশে এসব বিষয়ের দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে, যাতে খাদ্যের যথার্থ ব্যবহার হয় এবং অপচয় রোধ করা যায়।