বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ। অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়েছে, এখনো সেই ধকল অব্যাহত আছে। মধ্যবিত্তদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। অনেকের উপার্জন কমে গেছে। পাশাপাশি লাগামহীনভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে সব শ্রেণির মানুষের ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকছে না। এ কারণে অনেকেই সঞ্চয় করতে পারছেন না। কেউ ঋণ নিচ্ছেন, কেউবা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের চাহিদা মেটাতেই মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই তার গচ্ছিত সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। যাদের সঞ্চয় নেই, তাদের অবস্থা আরও দুঃসহ। অনেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
সাধারণ পেনশনভোগীরা তাদের সঞ্চয় রেখেও একধরনের অস্বস্তিতে আছেন। চাকরিজীবী বা বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ ব্যাংক, ডাকঘর সঞ্চয় ও বিমায় স্থায়ী আমানত রাখতেন। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের বেশ লভ্যাংশ দিত, যা দিয়ে তাদের সংসার চলে যেত। কিন্তু এখন ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের ওপর লভ্যাংশ এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, মানুষ সেই লভ্যাংশের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে পারছেন না। বরং মূল টাকা খরচ করে ব্যয়ভার মেটাতে হচ্ছে। কারণ সুদের হার অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন সঞ্চয়কারী তার সঞ্চয়ের ওপর যে মুনাফা পান তা দিয়ে তার সংসার চালানো অনেকটাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের সঞ্চয় আর ধরে রাখতে পারছেন না। অন্যদিকে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। এমনকি মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে।
বাংলাদেশের একটা বড় অংশের সাধারণ মানুষের কাছে জমানো টাকার লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগ ছিল সঞ্চয়পত্র। বর্তমানে নতুন করে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের চেয়ে পুরোনো সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালে সরকার সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমিয়ে দিলে অনেকেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এ ব্যাপারে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলার হার একটু বেড়েছে, অর্থাৎ টাকা তুলে ফেলার একটা মানসিক প্রবণতা চলে এসেছে মানুষের মধ্যে।
যেসব মাধ্যমে আমাদের দেশের মানুষ সঞ্চয় করতে পারেন, তার মধ্যে ব্যাংক, সরকারি বন্ড, পুঁজিবাজার, মিউচুয়্যাল ফান্ডসহ বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্কিম চালু ছিল, সেগুলো এখন আর আগের মতো নেই। ব্যাংকে যেমন আমানত কমেছে, তেমনি অন্যান্য সঞ্চয়ী খাতেও বিনিয়োগের প্রবণতা কমে গেছে। জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের বিক্রয়ের চেয়ে সুদ-আসল কমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সুদ কমানো ও নানা কড়াকড়ির কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসার জায়গা ছিল এই সঞ্চয়পত্র। কিন্তু সেটাতেও লভ্যাংশ কমানোয় অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন।
মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সঞ্চয়ে নির্ভরতা বাড়ানোর জন্য মুনাফার হার বৃদ্ধি করতে হবে। সঞ্চয়পত্র করার ক্ষেত্রে নিয়মের জটিলতা শিথিল করতে হবে। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন, সে জন্য সরকারকে উৎসাহী করে তুলতে হবে।