ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ড বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বেশি অশান্ত করে তুলবে। হামাসের দাবি অনুযায়ী, তাদের নেতা ইসমাইল হানিয়াকে ইরানে ‘জায়নবাদীরা’ হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে এক দেহরক্ষীসহ তিনি নিহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন গত বুধবার সকালে ইসমাইল হানিয়ার নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইসমাইল হানিয়া তেহরানে গিয়েছিলেন। ইসমাইল হানিয়া নিহত হওয়ার খবরে ফিলিস্তিনজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক বজ্রকঠোর মুখ। কিছুদিন আগে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার তিন ছেলে নিহত হন। ইসমাইল হানিয়াকে অনেক কূটনীতিক মধ্যপন্থি ঘরানার বাস্তববাদী নেতা হিসেবে মনে করেন। ১৯৮৭ সালে প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা গঠনের সময় তিনি হামাসে যোগ দিয়েছিলেন।
হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ইসরায়েলি সেনাদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেওয়ার আলোচনায় হানিয়া বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিরও চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঠিক এমন একসময়ে ইসমাইল হানিয়া নিহত হলেন, যখন একটা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছিলেন। গোটা বিষয়টির জেরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
হামাসের সশস্ত্র শাখা এরই মধ্যে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হানিয়ার মৃত্যু গাজার যুদ্ধকে নতুন দিকে নিয়ে যাবে এবং এর ব্যাপক প্রভাব থাকবে। অন্যদিকে হানিয়ার মৃত্যুতে ইরান তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। তাকে হত্যায় পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে দেশটি।
ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান নিজেদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সম্মান, গৌরব, মর্যাদা রক্ষা করবে এবং সন্ত্রাসী হামলাকারীদের তাদের কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ডের জন্য পস্তানোর ব্যবস্থা করবে।’
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক বিবৃতিতে হানিয়ার ওপর হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে বলেছেন, ‘অপরাধী এবং সন্ত্রাসী ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী অতিথিকে আমাদের বাড়িতে হত্যা করেছে। এতে আমরা মর্মাহত ও শোকাহত। কিন্তু তারা এ কাজ করে নিজেদের জন্য কঠোর সাজা পাওয়ার পথ প্রস্তুত করেছে।’
যদিও ইসরায়েল এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। এ ছাড়া হানিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করা হয়নি। কাতার, চীন, জর্ডান ও লেবানন এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯৭ সালে হামাস আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমেদ ইয়াসিনের অফিসের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন হানিয়া। এটি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করে। ২০১৭ সালের ৬ মে থেকে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নবিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাশেমি বিবিসিকে বলেন, ‘হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ড বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সর্বাত্মক যুদ্ধের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উচিত অবিলম্বে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা শুরু করা। একই সঙ্গে ইসরায়েলি গণহত্যা ও আগ্রাসন বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতির তাগিদ দেওয়া হলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েই যাচ্ছেন। এতে নারী-শিশুসহ অগণিত ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন।
এটা ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ। যেকোনো মূল্যে ওই অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। এ জন্য জাতিসংঘ তথা নিরাপত্তা পরিষদকে যুদ্ধ বন্ধ করতে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে হবে। শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।