গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর দেশের অন্যান্য খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও নেমে আসে ভয়ংকর স্থবিরতা। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি হাসপাতালে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে হাসপাতালগুলোর সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া চিকিৎসা ক্ষেত্রে দলীয়করণ দেশের স্বাস্থ্য খাতকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। এতে চরম খেসারত দিতে হচ্ছে চিকিৎসা খাতকে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বড় কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলে দ্রুত নিরাপদে কাজে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তা না হলে রোগীদের ভোগান্তি কমবে না। কয়েক হাজার সরকারি চিকিৎসক-কর্মচারী গা ঢাকা দিয়েছেন। এর সঙ্গে কয়েকদিন ধরে সারা দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরাও সেবা বন্ধ রেখে আন্দোলন করছেন। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঘেরাও করেছেন। রোগীর স্বজনরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। যেখানে রোগীদের সেবা পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
রাজনীতি আর চিকিৎসাসেবাকে এক করে গুলিয়ে ফেললে হবে না। চিকিৎসা পেশা থাকবে সেবার জন্য। কোনো চিকিৎসক নির্যাতনের শিকার হোন সেটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। তবে কারও বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে সেজন্য দেশে প্রচলিত আইন আছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করা শুভফল বয়ে আনবে না। রাজনীতি করেন বলে একজন চিকিৎসক হয়রানির শিকার হবেন এটা কাম্য নয়। অনেকে পদত্যাগের পাশাপাশি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বলছেন। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও কয়েকজন পরিচালকের পদত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়া আছে বলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের অনেকেই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন তাদের দরকার সঠিক চিকিৎসাসেবা। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে সব মিলিয়ে সরকারের আওতায় চিকিৎসক, নার্স মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারী ও অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীর পদ সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার। এর মধ্যে ৪১ হাজারের বেশি পদ আগে থেকে শূন্য পড়ে আছে। যা থেকে সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি বা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার বাদ রেখে বাকি পদগুলো সবই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভিত্তিক দৈনন্দিন জরুরি সেবায় নিয়োজিত থাকার কথা। যাদের মধ্যে উচ্চপদের কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন। আর এসব ক্ষেত্রে প্রতি স্তরেই রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশে সরকারি পর্যায়ের চিকিৎসক আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। যাদের মধ্যে ৭ হাজার আছেন বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি হিসেবে। যারা কোনো হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন না। এদের অনেকেই শাস্তিস্বরূপ, আবার অনেকের স্বেচ্ছায় সুবিধা নিতে ওএসডি সুবিধা ভোগ করেন। এমন অবস্থায় এখন অর্ধেকের বেশি সাবেক সরকারের সমর্থক কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা-কর্মীরা প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও সরকার পতনের পর থেকেই তাদের হটিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা জায়গা করে নেওয়ার জন্য মাঠে নেমেছেন। এ অবস্থায় রোগীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
প্রবীণ চিকিৎসক নেতা ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব খবরের কাগজকে বলেন, চিকিৎসকদের পেশাগত স্বকীয়তা ও ব্রত ক্ষুণ্ন করতে দলীয় বিভাজনই যথেষ্ট। এখান থেকে বের হতে না পারলে সময়ে সময়ে এভাবেই রোগীদের জিম্মি দশায় পড়তে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে এ সমস্যা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। পারস্পরিক সহাবস্থান বজায় রাখার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে চিকিৎসাব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে সরকার তৎপর হবে। আশা করছি, দ্রুতই অন্তর্বর্তী সরকার এ সমস্যার সমাধান করবে।