নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। রাষ্ট্রকে পরিপাটি করতে হলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ঘুণপোকার বাসা ভাঙতে হবে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুর্নীতি, অনিয়ম প্রতিরোধে জনসাধারণ বলছে, সংস্কার করতে হলে সরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ সবার আগে নিতে হবে। এটিকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অঙ্গ দুর্নীতি নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছে। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেশ পরিচালনা করার কৌশল শিখিয়ে দেবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। যাতে কেউ দুর্নীতি করার সাহস না পায়। রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে সব অনিয়ম-অনাচারের রাস্তা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা সত্যিকার অর্থে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে কেউ বঞ্চিত হলে তা আমলে নেওয়া হবে না।
দেশের রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ দুর্নীতি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। গত ১৫ বছরে সাবেক মন্ত্রী-এমপি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়ের শীর্ষে থাকা ৪২ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপির দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ জন্য তিনজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে নিশ্চিত করেছেন দুদক-সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতিবাজরা যাতে কোনোক্রমেই জাল থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য খুব দ্রুতই টাস্কফোর্স গঠন করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হবে বলে জানা গেছে। সাধারণ জনতারও দাবি একটাই- দ্রুতই দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনা হোক। তথ্যমতে, এই টাস্কফোর্সে সেনাবাহিনী, প্রশাসন, দুদক, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্বে থাকবেন। আর মূল অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে দুদকের হাতে। লজিস্টিক সাপোর্টও দুদককে দেওয়া হবে। দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর নেওয়া উদ্যোগ ফলপ্রসূ করতে হবে। সাধারণ জনগণ বহুদিন ধরে এটি প্রত্যাশা করছে। দুর্নীতিবাজদের ধরতে যৌথ বাহিনীর পাশাপাশি দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে তৎপর হতে হবে।
কিছু দুর্নীতিবাজ ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। এরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রচুর অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। দেশ ও দেশের বাইরে করেছেন সম্পদের পাহাড়। গত সরকারের আমলে প্রতিদিন এই দুর্নীতির খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাগুলো ফিকে হয়ে পড়ায় যে যেভাবে পেরেছে দুর্নীতি করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপক বিস্তার পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাবু করে ফেলেছে। বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতির অপরাধে অভিযুক্তদের দৃশ্যমান কোনো বিচারিক কার্যক্রমের পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটের এক মহোৎসব চলেছে। দেশের জনগণ রীতিমতো হতাশ। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে অসাধু সিন্ডিকেট সোচ্চার থেকেছে। সিন্ডিকেট চক্রের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে বাজারে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। যে যেমন পেরেছে দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট কেটেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সম্পদের হিসাব বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে। প্রতিটি সেক্টরে কাজের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে। দুর্নীতিবাজদের খুঁজে তালিকা করে বরখাস্ত এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।