অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ৮ আগস্ট শপথ নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সরকারের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। দেশ একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ থেকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে চলছে। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে বৈষম্য। ছাত্রদের আন্দোলনও ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে সাধারণ মানুষ। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরই শুরু হয়েছে নানা রকম দাবিদাওয়া নিয়ে ঢাকায় আসা মানুষের উপস্থিতি।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে এবং সচিবালয় ঘেরাও করে তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য বিক্ষোভ করছেন। সরকার তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করবে। তবে তারা এভাবে দাবিদাওয়া নিয়ে রাজপথে না থেকে সেমিনার, কর্মশালা বা লিখিতভাবে জানাতে পারেন উচ্চপর্যায়ে। তখন তারা এটির একটি যৌক্তিক সমাধানের পথ তৈরি করবেন। অন্যদিকে হঠাৎ করে ১১টি জেলায় বন্যাকবলিত হয়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারকে এ সংকট উত্তরণের জন্যও কাজ করতে হচ্ছে।
এ জন্য দরকার সবার সহযোগিতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এ সরকারের চ্যালেঞ্জ অনেক রয়েছে। দুই সপ্তাহ পার হয়েছে এই সরকারের পথচলা। এ কদিনেও জনপ্রশাসনে অস্থিরতা কমেনি। সেবা গ্রহীতারাও তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত। তাই এদিকটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এ জন্য সাধারণ মানুষের আকাশচুম্বী স্বপ্ন ও চাওয়া রয়েছে এ সরকারের কাছে।
গত রবিবার সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণ বর্তমান সময়ের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। তিনি বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, সেই স্বপ্ন পূরণে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট।
তারা রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার প্রশ্নে একমত হলেও কোনো কোনো দল ওই ভাষণে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ বা রূপরেখা না থাকার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিএনপি বলছে, এই ভাষণে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে তারা। তবে নির্বাচনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ নেই। জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল প্রধান উপদেষ্টার ভাষণকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা সংস্কারের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এ সরকারকে সময় দেওয়ার কথা বলছে।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ দিকনির্দেশনামূলক। তিনি তার ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান গ্রহণের বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার থাকবে পুরোপুরি সুরক্ষিত। আমাদের লক্ষ্য একটিই- উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আমরা এক পরিবার। আমাদের লক্ষ্য এক। কোনো ভেদাভেদ যেন আমাদের স্বপ্নকে ব্যাহত করতে না পারে, সে জন্য আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি সবার সহযোগিতার কথা বলেছেন। এখনই সব দাবি পূরণ করার জন্য জোর করা, প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যক্তিবিশেষকে হুমকির মধ্যে ফেলার যে প্রবণতা তা থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন সব আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করার কথা জানান।
বিদেশি সাংবাদিকরা যাতে এ দেশে সহজে প্রবেশ করতে পারেন, সে জন্য দ্রুত ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। যার অংশ হিসেবে উপদেষ্টারা তাদের নিজ নিজ সম্পদের বিবরণ দেবেন। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জন্য সম্পদের বিবরণ দেওয়াও বাধ্যতামূলক করবেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিটি বক্তব্যের স্পষ্টতা আমরা লক্ষ করেছি। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা।
অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার প্রস্তাবের কথা বলেছে, তা সবই বাস্তবসম্মত। দেশ সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। এই সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সবার সহযোগিতা দরকার। দেশকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি দেশের আপামর জনসাধারণকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।