নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে রূপসী এলাকায় দুর্বৃত্তদের লুটপাট ও তাদের দেওয়া আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে গাজী টায়ারের কারখানা। সেই সঙ্গে ভস্মীভূত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। বেকার হয়ে পড়েছেন এতগুলো মানুষ। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে শিল্প রক্ষা জরুরি। দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থার প্রেক্ষাপটে একশ্রেণির দুর্বৃত্তায়ন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগুন ও লুটপাটের ধ্বংসযজ্ঞ যেন থামছেই না।
এদিকে কারখানায় প্রবেশ করে নিখোঁজ হয়েছেন এমন ব্যক্তির খোঁজে গাজী টায়ার কারখানায় স্বজনরা ভিড় করলে নিখোঁজের তালিকা করে ফায়ার সার্ভিস। সেই তালিকা অনুযায়ী আগুনের ঘটনায় অন্তত ১৭৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদল ছাত্র আরেকটি তালিকা প্রস্তুত করেন। প্রায় ৩১ ঘণ্টা পর কারখানার আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
খবরের কাগজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার কারখানার মালিক সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর একদল দুর্বৃত্ত ৪০ একরের অধিক জায়গার ওপর স্থাপিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বলপূর্বক অনুপ্রবেশ করে লুটপাট চালায়।
এরপর কারখানাটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কারখানাটিতে নানা রকম দাহ্য পদার্থ থাকায় মুহূর্তেই মূল্যবান সম্পদ ভস্মীভূত হয়ে যায়। সহস্র কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি ১৭৬ জনের হদিসও মিলছে না। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করতে একটি কমিটি করা হয়েছে জানিয়ে গাজী টায়ারের নির্বাহী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, শুধু টায়ার কারখানাই নয়, পাইপ কারখানাতেও ওই দিন আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
প্রতিটি শিল্প-কারখানা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকে। গাজী টায়ার কারখানাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই শিল্পে হাজারও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল। এতে দেশের পরিবহন খাত লাভবান হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলো দেশের অর্থনীতি।
দেশের শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশি পণ্যের বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিরাজমান জটিলতা নিরসনেও শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প গন্তব্য খুঁজবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টারা হামলা-লুটপাট বন্ধে বারবার আহ্বান জানালেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটানো খুবই হতাশাব্যঞ্জকই বলতে হয়। কারখানা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা তৎক্ষণাৎ জানানোর পরও স্থানীয় পুলিশ বা অন্য কোনো নিরাপত্তা বাহিনী এতে সাড়া দেয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফলে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর গাজী টায়ার কারখানায় লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সরকার পতনের পর রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব স্থানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে প্রতিপক্ষের বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায় একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। বহু সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানও এহেন কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পায়নি। অথচ এগুলো দেশের সম্পদ। প্রত্যেক দেশপ্রেমিক নাগরিকের ওপর এগুলো সংরক্ষণ করার দায়িত্ব বর্তায়।
শিল্প-কারখানা রক্ষায় দেশের অনেক কারখানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনসহ নানা নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে আরও জোর তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। আর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন ধ্বংস না হয় এবং দেশের মানুষ যাতে রাজনৈতিক আক্রোশের কারণে বেকার হয়ে না পড়েন, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রত্যেক নাগরিককে সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। যারা এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ও অপকর্ম করছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।