বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো ১১ জেলায় ১০ লাখের বেশি পরিবার পানিবন্দি। বন্যাজনিত নানা ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২-এ। এর মধ্যে ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়ার পর থেকে পদ্মা নদীতে পানির চাপ বাড়ছে। এতে নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ দেখা যাচ্ছে। ফলে পদ্মাপারের মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এরই মধ্যে কোথাও কোথাও পানি সরে যাওয়ায় জমাটবদ্ধ কাদা বন্যার ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎহীন হয়ে আছে অনেক এলাকা। মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি। স্বজনদের খোঁজ নিতে না পারায় অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ১১ জেলার চলমান বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় বন্যার্ত মানুষ বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন।
এসব জেলায় পানি ধীর গতিতে নামছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বন্যাদুর্গত এলাকায় বরাদ্দকৃত ত্রাণের পরিমাণ কম। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য মানুষ ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছে। অনেকেই বলছেন, ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্গত এলাকায় ঠিকভাবে ত্রাণ যাচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসন ও বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা সরকারের সহায়তা চেয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারিসহ সকল পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য কয়েকটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে।
বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে। ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় বন্যাকবলিত এলাকায় বয়স্ক ও শিশুরা সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে অনেকের হাত-পায়ে ঘা, খোসপাঁচড়া দেখা দিচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক বন্যার পানিতে ডুবে আছে।
এ কারণে পর্যাপ্ত ওষুধপত্র ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানি। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, তিন স্তরে ভাঁজ করা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে ছেঁকে পানি পান করলে সে পানি থেকে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়। বন্যার্তদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ক্লোরিন ট্যাবলেট সরবরাহ করতে হবে উপদ্রুত এলাকায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার সময় নানা রকম আবর্জনা ভেসে আসে। মানববর্জ্য, পশুর বর্জ্য, কীটনাশক বা অন্যান্য রাসায়নিক উপকরণও ভেসে আসে পানির সঙ্গে। ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড আর জন্ডিসের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। শ্বাসতন্ত্র ও ত্বকের সংক্রমণও হয়ে থাকে। হাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময়ে নিরাপদ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা, আবাসস্থল পরিষ্কার করা ও জমে থাকা পানি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাঁচি-কাশির আদবকেতা মেনে চলতে হবে। এ সময় মশাবাহিত রোগও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ডেঙ্গুর উপদ্রুব বাড়তে পারে। তাই সবাইকে মশাবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার করতে হবে।
পানি নামার সময় থেকে মানুষ খাদ্য ও জ্বালানির সংকটে পড়তে পারেন। ঘরবাড়িগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ সময় পানির সঙ্গে ভেসে আসে বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও সাপ। ঘরবাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেয় এসব পতঙ্গ। তাই বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। চিড়া, মুড়ি, ছাতু, বিস্কুট, গুড়, গুঁড়া দুধ- এ ধরনের শুকনা খাবার উপদ্রুত অঞ্চলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে ত্রাণ সরবরাহকারীদের।
বন্যা-পরবর্তী প্রভাব দেশের কয়েকটি বন্যাদুর্গত এলাকায় ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা-পরবর্তী প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।