সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি ও বাঙালি সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। মোটরসাইকেল চুরিকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে এক বাঙালি যুবকের হত্যার জের ধরে এ ঘটনাটি ঘটে। এরপর হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতায় উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। সংঘাতে এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জনপদ। এ পর্যন্ত দুই জেলায় চারজন নিহত এবং অন্তত ৮০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পার্বত্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, চলমান হামলা, আক্রমণ এবং প্রাণহানির ঘটনায় সরকার গভীরভাবে দুঃখিত ও ব্যথিত। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে এবং পার্বত্য তিন জেলায় বসবাসকারী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণে সরকার বদ্ধপরিকর।
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পূর্বাপর তুলে ধরে আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গত শুক্রবার বিকেলে আইএসপিআর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চলমান উত্তেজনা তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে। সেখানে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় পক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করছে। পাহাড়িরা বলছেন, অতর্কিতভাবে পাহাড়িদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বাঙালিদের অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিজেদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে পাহাড়িরা। উপাসনালয় আক্রমণ করা হয়েছে। এটি খুবই নিন্দনীয় ঘটনা। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ৭২ ঘণ্টার অবরোধের ডাক দেয় ইউপিডিএফ। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
দেশের বিশিষ্টজনরা পাহাড়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে স্থানীয় নেতাদের এগিয়ে আসতে এবং দ্রুত পুনর্বাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, পাহাড়ে সহিংসতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাহাড়ে ভূমির বিরোধসহ জিইয়ে রাখা সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে, তবেই পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফিরতে পারে। পাহাড়ের অস্থিরতা নিরসনে রাঙামাটিতে তিন উপদেষ্টা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গতকাল শনিবার।
পুলিশ বাহিনী এখনো আস্থাহীনতায় থাকায় তারা এখনো ভালোভাবে সংগঠিত হতে পারেনি। সরকারও চেষ্টা করছে, যত দ্রুত তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। এ ছাড়া সম্প্রতি সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমন সময়ে পাহাড়ে যাতে সমস্যা বৃদ্ধি না পায়, সেদিকটা সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে সেনাবাহিনীকে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অনেক ক্যাম্প ও বিজিবি ক্যাম্প রয়েছে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারও এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
দুই যুগের বেশি সময় শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় সামান্য ঘটনা থেকে বড় ঘটনার জন্ম দিচ্ছে পাহাড়ে। এ ছাড়া গুজব সংবাদ ও পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করছে। সেখানে দীর্ঘদিনের ভূমি সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। সমস্যাগুলো বহুদিন জিইয়ে থাকায় যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পাহাড়ি জনপদ। দেশের চলমান নাজুক পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনও এক রকম অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা করা যেতে পারে। আশা রাখি, অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। পাহাড়ি-বাঙালি একে অপরের ভাই। তাই সবার সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। পাহাড় ও সমতলে শান্তি ফিরে আসুক, এটাই প্রত্যাশা।