নগরীতে প্রতিনিয়ত দাবিদাওয়া, সভা-সমাবেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় যানবাহনের গতি কমে গেছে, বেড়েছে যানজট। রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে বিগত সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও তা কমেনি বরং সড়কগুলো এখন ব্যক্তিগত গাড়িতে ঠাসা। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এখন শতভাগ ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন গড়ে ৪০টি করে ব্যক্তিগত গাড়ি নামছে।
২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার; যা ২০২৩ সালে হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার। ইতিপূর্বে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার বেশকিছু এখন দৃশ্যমান। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এর অন্যতম। বেশকিছু প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুজন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বৈঠকে এ নির্দেশনা দেন। নির্দেশনায় ট্রাফিক পুলিশকে কিছু পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে বলা হয়। যার মাধ্যমে যানজট কমানোর জন্য প্রথমে দু-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বাস থামানোর স্থানে ২ মিনিটের কম সময় রাখার ব্যবস্থা এবং পরবর্তীতে এটি অন্যান্য সড়কে প্রয়োগ করা হবে বলে নির্দেশনায় বলা হয়। সেই সঙ্গে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিজস্ব সমাধান খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।
ঢাকার গণপরিবহনে এক ধরনের অরাজকতা লক্ষ করা যায়। গণপরিবহনগুলোর রাস্তায় এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের পাল্লা দেওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। এখনো রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায় লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি। যাত্রীবাহী বাসগুলো থামানো হয় রাস্তার মাঝখানে। যত্রতত্র তোলা হয় যাত্রী। নির্দিষ্ট কোনো সময়ও মেনে চলে না। এরা ট্রাফিক সিগন্যালও মানতে চায় না। অথচ সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে এসব বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। যা যানজট নিরসনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমোদন থেকে শুরু করে চলাচলের পদ্ধতি, সবই সমস্যাসঙ্কুল। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা এতটাই দুর্বল যে, এর ফলে একদিকে যানজট বৃদ্ধি পায় এবং যাত্রীসেবার মানও কমে। সেই সঙ্গে বাড়ে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা। জাইকার এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকায় দরকারি যাতায়াত বা কাজে যাওয়ার জন্য ৬০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহন ব্যবহার করেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এটি দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ফলে একদিকে সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে; সেই সঙ্গে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। এই পরিবহনগুলো চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না। তাই প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করতে হবে। আমরা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সেসব দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা খুবই উন্নত। এর ফলে ওই সব দেশের নাগরিকরা ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লিতে একসময় প্রচুর যানজট লেগেই থাকত। সেখানে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় গণপরিবহন ব্যবস্থা যাত্রীবান্ধব হয়েছে। সেই সঙ্গে দুর্ঘটনাও হ্রাস পেয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে যানজট নিরসনে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের গণপরিবহন উন্নত হলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমে যাবে। এতে সড়কে যানজট কমবে। গণপরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট চক্র রয়েছে। এগুলো ভেঙে দিতে হবে। আশা করছি, অন্তর্বর্তী সরকার অচিরেই রাজধানীর যানজট নিরসনে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।