ইসরায়েলের বিমান হামলায় লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লার প্রধান সাইয়েদ হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হয়েছেন। গত শনিবার এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরানপন্থি সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ৩২ বছর ধরে তিনি এই সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর কৌশলগত নেতা ছিলেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম পরিচিত এক মুখ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন ছিলেন তিনি। তার হত্যার মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সংকট আরও ঘনীভূত হলো। সম্প্রতি ইরানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া। গুপ্তহত্যাসহ নানা কৌশলে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে হামাস ও হিজবুল্লাহ-সমর্থিত নেতাদের হত্যা করে চলেছে ইসরায়েল। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যা রীতিমতো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামাস এবং হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যার মধ্যদিয়ে ইসরায়েল বিশ্বকে কী বার্তা দিতে চাইছে। আসলে কি তারা যুদ্ধ না শান্তি চেয়েছে। এসব প্রশ্ন এখন শান্তিকামী মানুষের মুখে।
সম্প্রতি ইসরায়েলের হামলায় বহু বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছেন। গত কয়েক দিনের হামলায় লেবাননে নারী ও শিশুসহ ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ। এত বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও ইসরায়েল দাবি করছে, তারা শুধু হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা করছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জেমস ডরসির ভাষ্যমতে, শুক্রবারের হামলা এটাই প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই, একই সঙ্গে তারা হিজবুল্লাহর অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে।
গত শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে বার্তা দিয়েছেন তা মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তার বক্তব্যের মধ্যদিয়ে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি আরও মানুষ হত্যা করতে চান। নেতানিয়াহু বলেন, তেহরানের বিভিন্ন অত্যাচারী বাহিনীর প্রতি আমার একটি বার্তা রয়েছে, তা হলো, আপনারা যদি আমাদের ওপর হামলা চালান, আমরাও পাল্টা হামলা চালাব। ইরানের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ইসরায়েলের হাত পৌঁছাবে না। নাসরাল্লাহকে হত্যার মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্য চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা নাসরাল্লাহর গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। এর পর ঘটল এই হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডকে কাপুরুষোচিত ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছে হামাস। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান এ হত্যার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের পক্ষে বলেছেন, হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতির মতো ইরানপন্থি শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় ইসরায়েলকে সর্বাত্মক সমর্থন দেবে ওয়াশিংটন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহ ও ইরানপন্থি অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনের সংঘাত থামাতে আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের ভাষ্যও একই। গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, আমাদের অবশ্যই যেকোনো মূল্যে আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে হবে।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লার চলমান পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক হারে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বসম্প্রদায়কে এ যুদ্ধ থামানোর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বরং বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামাতে দ্রুত যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সমূহসম্ভাবনা রয়েছে। এখনই ঘনীভূত সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে যুদ্ধবিরতির আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে গণহত্যা বন্ধ হোক, শান্তি ফিরে আসুক, সেটিই প্রত্যাশা।