নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য আদিকাল থেকে সমাজে চলে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানের নারীর অধিকার নিশ্চিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। ধারাগুলোর যথার্থ বাস্তবায়ন হলে দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য অনেকটা দূর করা সম্ভব হতো। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সমাজ বাস্তবতায় সংবিধানের ধারার যথার্থ বাস্তবায়ন আজও সম্ভব হয়নি। নানা ক্ষেত্রে নারীরা নিষ্পেষিত এবং বৈষম্যের শিকার। নারীরা সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত। এ বৈষম্য দূর করতে নারী অধিকার কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে বিভিন্ন নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে। তাছাড়া নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন নারী অধিকার কর্মীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নতুন করে সোচ্চার হয়েছেন নারী অধিকার কর্মীরা।
নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে আন্তর্জাতিক যে প্রয়াসগুলো রয়েছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ হলো জাতিসংঘে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সনদটি গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে এ সনদে স্বাক্ষর করে। কিন্তু অনুমোদন করলেও সিডও সনদ পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়নি বাংলাদেশ। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিডও সনদে স্বাক্ষর করার পরও দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেছে। অথচ এ সংরক্ষণ তুলে না নিলে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর হবে না। এর মাধ্যমে আমরা সংবিধান পরিপন্থি কাজ করছি। কারণ, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা সংবিধানে বলা হয়েছে, সেখানে আমরা সিডওর এই দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখে সংবিধান লঙ্ঘন করছি। অবিলম্বে এ সংরক্ষণ তুলে নিতে হবে।
নারী অধিকার কর্মীদের মতে, নারীপক্ষ থেকে সিডওর সংরক্ষণ তুলে নেওয়ার দাবি আমরা জানিয়েছি। এর ফলে উত্তরাধিকার, পারিবারিক, নাগরিকত্ব ও অভিভাবকত্বসহ বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার ও দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করাসহ নারীকে সব ধরনের বৈষম্য থেকে রক্ষা করা যাবে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা দরকার। গত ২০ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নারী অধিকারকর্মীদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অধিকার রক্ষায় যেসব বিষয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে বিষয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য ‘নারী অধিকার কমিশন’ গঠনের দাবি উঠে এসেছে। সঙ্গে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক যত আইন রয়েছে তা বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না খবরের কাগজকে বলেন, সংবিধানে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং সম্পত্তিতে এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব আইনে নারীরও সমান অধিকার পাওয়ার কথা। এর পাশাপাশি যেসব আইন রয়েছে, যেমন- নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ আইনের বিচারের সময় আসামির জামিন ভুক্তভোগী নারীর জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে। এ জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট আইনের পরিবর্তন ও সঠিক প্রয়োগ।
নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য রোধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একটি নারী অধিকার কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা যুগোপযোগী একটি উদ্যোগ। বৈষম্য নিরসনে এ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক আইন পরিবর্তন ও পরিমার্জন প্রয়োজন। সমস্যা বিশ্লেষণ করে একটি বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন করতে পারলে নারীর প্রতি বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।