ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক আক্রমণ শুরু হয়েছে। বেশ কয়েক দিন ধরে দুই পক্ষই এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহালগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর আগে ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর কাশ্মীরে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভয়াবহ হামলা। এই হামলায় পাকিস্তান জড়িত বলে অভিযোগ তুলে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের পাশাপাশি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জবাবে সিমলা চুক্তি স্থগিত এবং ভারতীয় বিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান। স্থগিত করে দেওয়া হয় ভারতের সঙ্গে সব রকম বাণিজ্যও। এর পর থেকে চিরবৈরী দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। হুমকি-পাল্টা হুমকি আর রণসজ্জার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই যুদ্ধের দিকে যাচ্ছিল। ৭ মে মঙ্গলবার মধ্যরাতে সেই আক্রমণ বাস্তবে রূপ নিল।
পাকিস্তান জানাল, পাকিস্তানের ছয় স্থান— পাঞ্জাবের শিয়ালকোট, ভাওয়ালপুর ও মুরিদকে এবং পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফ্ফরাবাদ, বাগ ও কোটলি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ভারত। এই আক্রমণে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ভারত এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’।
পাকিস্তান জানায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা হামলায় অংশ নেওয়া ভারতের পাঁচটি জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করেছে। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেডের সদর দপ্তর ও তল্লাশিচৌকিও গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে বুধবার সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাকিস্তানি সেনাদের গোলাবর্ষণে ৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হতাহতের এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগ-উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। শঙ্কা দেখা দিয়েছে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার। দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের ভেতরকার সামরিক সংঘাত বিশ্ব শান্তির জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাই শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বিশ্বের অন্য দেশগুলোকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের হামলাকে ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। দ্রুত এই সংকটের সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও। তিনি এই যুদ্ধ বিশ্বের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যুদ্ধ হলে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশগুলো সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কী অর্থনীতি, কী জনজীবন, কী জীবন-জীবিকা, কোনো কিছুই স্বাভাবিক থাকে না; স্থবির হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। বেশ কয়েক বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের দৃষ্টান্ত থেকেই তা বোঝা যায়। সেই যুদ্ধের প্রভাবে গোটা বিশ্বকে আজও ভুগতে হচ্ছে। বাংলাদেশও এর অভিঘাতে বিপন্ন হয়ে পড়ে।
ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ দুটি সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হলে আর তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। আমাদের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জনজীবনে সংকট দেখা দিতে পারে। এই মুহূর্ত থেকে আমরা তাই এই দুই দেশকে আক্রমণ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছি। বিশ্বের প্রভাবশালী বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোকে আমরা আহ্বান জানাব দেশ দুটিকে থামাতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক বেশ ভালো। ট্রাম্প ইতোমধ্যে এই যুদ্ধ সম্পর্কে ‘হতাশা’ প্রকাশ করেছেন।
নিশ্চয়ই তিনি আক্রমণ বন্ধে এগিয়ে আসবেন। বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলোও এই ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশেরও সুযোগ রয়েছে যথাযথ ভূমিকা পালনের। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে জাতিসংঘকে; যদিও জাতিসংঘ সেভাবে বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ বন্ধে খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, এমন নয়। তবু জাতিসংঘ অনতিবিলম্বে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে ব্যবস্থা নিতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিও আমাদের আহ্বান থাকবে অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়; আলোচনার মাধ্যমেই সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আমরা চাই অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। যুদ্ধমুক্ত থাকুক দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব।