শিশুদের শিক্ষাজীবনে পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে পরীক্ষার আগে মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা ভয় তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। অভিভাবক ও শিক্ষকের সচেতন ভূমিকা শিশুদের এই চাপ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে। লিখেছেন তাসকিন
সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা
পরীক্ষার আগে শিশুদের সবচেয়ে বড় চাপ আসে সময় ব্যবস্থাপনার অভাব থেকে। অনেকেই শেষ মুহূর্তে পড়াশোনা সেরে নেওয়ার চেষ্টা করে, যা উল্টো চাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই ছোটবেলা থেকেই একটি নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়া, বিশ্রাম, খেলাধুলা ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। এতে শিশু পরীক্ষার আগে হঠাৎ করে অতিরিক্ত পড়ার প্রয়োজন বোধ করবে না। অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে একটি বাস্তবসম্মত পড়াশোনার রুটিন তৈরিতে সাহায্য করলে তা পরীক্ষার আগের চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলা
পরীক্ষাকে অনেক শিশু ভয়ংকর একটি বিষয় হিসেবে দেখে। এই ভয় থেকেই মানসিক চাপ তৈরি হয়। অভিভাবক ও শিক্ষকরা যদি পরীক্ষাকে শুধু মূল্যায়নের একটি ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তবে শিশুরা পরীক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলবে। ছোট ছোট সাফল্যের প্রশংসা করা, ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা- এসব শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। যখন শিশু বুঝবে পরীক্ষা ভয়ের কিছু না, বরং শেখা বিষয় যাচাইয়ের একটি মাধ্যম করা তখন চাপ কমে গিয়ে আত্মবিশ্বাস জায়গা করে নেবে।
পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর খাবার
পরীক্ষার সময় অনেক শিশু রাত জেগে পড়তে চায়, যা স্বাস্থ্য ও পড়াশোনার জন্য ক্ষতিকর। ঘুমের ঘাটতি মনোযোগ কমায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে এবং সহজে বিরক্তি তৈরি করে। তাই প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সঠিক খাবারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভাজাপোড়া ও জাংক ফুড এড়িয়ে ফল, সবজি, দুধ, ডিম ও বাদামের মতো পুষ্টিকর খাবার খেলে শরীর ও মন দুটোই সতেজ থাকে। সুস্থ শরীরেই ভালো পড়াশোনা সম্ভব।
.jpg)
নিয়মিত বিশ্রাম ও বিনোদন
অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ শিশুদের ক্লান্ত করে তোলে এবং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে। পরীক্ষার প্রস্তুতির ফাঁকে ছোট বিরতি নেওয়া জরুরি। অল্প সময় হাঁটাহাঁটি, হালকা খেলা, গান শোনা বা প্রিয় কোনো শখের কাজে যুক্ত হওয়া শিশুদের নতুন উদ্যম এনে দেয়। টানা পড়াশোনা করার চেয়ে মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নেওয়া পড়ার মান বাড়ায়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও বিনোদনকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
খোলামেলা আলোচনা ও সহমর্মিতা
পরীক্ষার সময় শিশুর মনে নানা ধরনের ভয় কাজ করে- ‘ভালো ফল করতে না পারলে কী হবে?’, ‘অভিভাবকরা কী বলবে?’ এমন প্রশ্ন তাদের মানসিকভাবে চাপে ফেলে। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। সন্তান কোন বিষয়ে সমস্যায় পড়ছে তা জানা, সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা এবং সহমর্মিতা দেখানো অত্যন্ত জরুরি। যখন শিশু বুঝবে তার সমস্যা অভিভাবক বুঝতে চাচ্ছে, তখন মানসিক চাপ অনেকটা দূর হয়ে যাবে।
ফলাফলের চেয়ে শেখার ওপর জোর
বলতে গেলে প্রায় সব পরিবারেই পরীক্ষার ফলাফলকে জীবনের বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয়। ফলে শিশুরা সব সময় ভালো নম্বর পাওয়ার চাপে থাকে। কিন্তু আসলে শেখাই মূল বিষয়, নম্বর নয়। অভিভাবক ও শিক্ষক যদি শেখার প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবে শিশু পড়াশোনায় আনন্দ খুঁজে পাবে। এক্ষেত্রে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, একটি পরীক্ষার খারাপ ফলাফল জীবনের সমাপ্তি নয়। বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণের একটি ধাপ।
/রোদসী