জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার মতো অপরাধ করেও রেহাই পেয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। মামলাটিতে তিনি অভিযুক্ত হলেও রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ায় লঘুদণ্ড হিসেবে তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। তবে অপর দুই অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনাল।
চৌধুরী মামুনকে লঘুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের অপরাধ- মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য। তবে তিনি তার অপরাধ স্বীকার করে নেন এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাজসাক্ষী হিসেবে সহযোগিতা করেন। তিনি অপর দুই আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন, যা মামলার চূড়ান্ত রায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্বীকারোক্তি এবং আইনি সহায়তার কারণেই ট্রাইব্যুনাল তাকে লঘুদণ্ড দিলেন।’
গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠনের দিন নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন একমাত্র কারাবন্দি আসামি চৌধুরী মামুন। ট্রাইব্যুনালও সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। যদিও অন্য দুই আসামির মতো তিনিও একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন, তবে রাজসাক্ষী হওয়ায় বিচার শেষে তিনি আদালতের অনুকম্পা পেলেন।
গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে তার নির্দেশে পুরো পুলিশ বাহিনী সারা দেশে সক্রিয় ছিল। আন্দোলন ঠেকাতে মারণাস্ত্র ব্যবহার থেকে শুরু করে পুলিশের সব ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার অধীনেই। তবে তিনিও সরকারপ্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক পুলিশ বাহিনীকে পরিচালনা করেছেন বলে ট্রাইব্যুনালে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ফলে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনিসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অভিযুক্ত হন। তিনি অভিযোগের দায় স্বীকার, সব আসামির অপরাধ ও সব ঘটনার সত্য তুলে ধরতে আগ্রহী হওয়ায় তাকে রাজসাক্ষী ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। তখন থেকেই আসামি হিসেবে নয় বরং রাজসাক্ষীর মর্যাদায় তিনি কারাগারেই আছেন। প্রতি ধার্য দিনে তাকে কারাগার থেকে এনে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গতকাল রায় ঘোষণার দিনেও তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। অর্থাৎ রায় ঘোষণার সময় তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। এই রায়ের আদেশ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দি থাকবেন। এ মামলায় অপর দুই আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল গত বছরের ৫ আগস্ট, অর্থাৎ এ মামলার শুরু থেকেই পলাতক আছেন।
উল্লেখ্য, ‘রাজসাক্ষী’ শব্দটি এসেছে মূলত ‘রাজা’ ও ‘সাক্ষী’ শব্দ দুটি থেকে। ১৮৭২ সালে সাক্ষ্য আইন প্রণয়নের সময় রাজার রাজ্য প্রথা ছিল। সেই সময় এ ধরনের সাক্ষীকে রাজসাক্ষী বলা হতো। এখন রাজাও নেই, রাজত্ব প্রথাও নেই। এখন রাষ্ট্র। তাই রাজসাক্ষীকে বর্তমানে রাষ্ট্রের সাক্ষী হিসেবে গণ্য করা হয়। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কোনো আসামি অপরাধের সাক্ষী দিতে রাজি হলে তাকে রাষ্ট্রের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে গণ্য করা হয়। আইন অনুসারে তাকে রাজসাক্ষী বা অ্যাপ্রুভার বলা হয়। কোনো আসামি রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিতে রাজি হলে, আদালত প্রথমে তাকে রাজসাক্ষী ঘোষণা করেন। রাজসাক্ষী হলেও তাকে কারাগারেই রাখা হয়, যাতে অন্য কোনো আসামি বা ব্যক্তি তাকে প্রভাবিত করতে না পারে অথবা তার কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
আদালত রায় দেওয়ার আগেই বিচার চলাকালে অপরাধটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বা ঘটনা সম্পর্কে গোপন তথ্যের অধিকারী কোনো ব্যক্তির অপরাধের সব ঘটনা, মূল অপরাধী ও সহায়তাকারী হিসেবে জড়িত সব অপরাধী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য প্রকাশ করে সাক্ষ্য দেওয়া সম্পন্ন হলে আদালত ওই রাজসাক্ষীকে ক্ষমা করতে পারেন। রাজসাক্ষী ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যাবশ্যক কোনো কিছু গোপন করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে বা যে শর্তে সাক্ষী করা হয়েছিল সেই শর্ত পালন না করলে আদালত রাজসাক্ষীরও বিচার করতে পারবেন। যে অপরাধের বিষয়ে রাজসাক্ষীকে ক্ষমা করা হয়েছিল আদালত সেই অপরাধের বিষয়ে তার বিচারও করতে পারবেন। তবে রাজসাক্ষীকে অন্য আসামিদের সঙ্গে একত্রে রেখে বিচার করা যাবে না।