শেখ হাসিনার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে বহনকারী হেলিকপ্টারকে ভারতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর।
মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) তিনি লোকসভায় এ-সংক্রান্ত একটি বিবৃতি পড়ে শোনান।
এর আগে সর্বদলীয় বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে সতর্ক অবস্থানে ভারত। দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’
পার্লামেন্টে বিবৃতিতে জয়শঙ্কর বলেন, গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে পৌঁছান শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার অনুরোধের পর স্বল্প সময়ের মধ্যে তাকে বহনকারী হেলিকপ্টারকে ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
পার্লামেন্টে বিবৃতি পড়ে শোনানোর আগে জয়শঙ্কর বাংলাদেশের ঘটনাবলি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক করেন। অন্যদিকে সোমবার রাতেই এস জয়শঙ্কর বৈঠক করেছিলেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে।
বিবৃতিতে জয়শঙ্কর বাংলাদেশে কয়েক দিন ধরে চলা সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশটিতে বর্তমানে ১৯ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে ৯ হাজার ফেরত এসেছেন। বাকিদেরও আনার চেষ্টা চলছে।’
যদিও সর্বদলীয় বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, পরিস্থিতি এমন কিছু ঘোলাটে নয় যে, সে দেশে অবস্থানকারী ভারতীয়দের ফেরত আনতে হবে।
বৈঠকের পর জয়শঙ্কর নিজেই বলেন, ‘পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে সবাই দৃঢ়ভাবে সরকারের সঙ্গে আছেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য ভারত সরকার তাকে কিছুটা সময় দিতে রাজি। ইতোমধ্যে বিষয়টি তাকে জানানো হয়েছে।’
সর্বদলীয় বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি ও রাজ্যসভার বিরোধী নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্য দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, জয়শঙ্কর বৈঠকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারত সরকারের কিছু আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করতে ভারত সরকার তাকে কিছুটা সময় দিতে রাজি, তা তাকে জানানো হয়েছে।’
বৈঠকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে সে দেশে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্ভবত গঠিত হতে চলেছে। কাজেই ভারতের দুটি পরিকল্পনা করে রাখা উচিত। একটি মাঝারি মেয়াদের, অন্যটি দীর্ঘ মেয়াদের। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেখতে আগ্রহী।’
জয়শঙ্কর এর জবাবে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো টলমলে। ক্রমাগত রূপ বদলাচ্ছে। কাজেই দেখেশুনে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বৈঠকের একজন নেতার প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, ‘সে দেশের কোনো কোনো এলাকায় ভারতবিরোধী মনোভাব দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে যারাই সরকারে থাকুক, ভারত সরকার তাদের সঙ্গে কাজ করবে।’
বৈঠক শেষে শিবসেনার প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, ‘বাংলাদেশে যাই ঘটুক, তার প্রভাব ভারতের ওপর পড়ে। সেখানে নৈরাজ্য দেখা দিলে ভারতের জন্য তা মঙ্গলজনক হতে পারে না। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে ভারতীয়দের ফিরিয়ে আনতেও দেশকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’
সোমবার সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ভারতে পৌঁছান। দিল্লির উপকণ্ঠ গাজিয়াবাদের কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে তার সঙ্গে দেখা করেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। সোমবার রাতেই খবর রটে হাসিনা ভারত থেকে লন্ডনে যাবেন। সর্বদলীয় বৈঠকে জয়শঙ্করের মন্তব্য থেকে মনে করা হচ্ছে, লন্ডন যাত্রার দিনক্ষণ হয়তো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে ভারত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে বৈঠকে জয়শঙ্কর বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, তাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জড়িত থাকতে পারে।’
এ সময় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানতে চান, বাংলাদেশ ইস্যুতে বাইরের কোনো গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে সরকারের কাছে তথ্য আছে কি না। উত্তরে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত সরকারের কাছে শুধু এই তথ্য আছে যে, পাকিস্তানের কূটনীতিকরা বিক্ষোভের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেছেন।
কলকাতা উপহাইকমিমনের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে
কলকাতা প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সেখানে কলকাতা পুলিশের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার অধীনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিনের তুলনায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তত ১৫-২০ জন পুলিশ কনস্টেবল মোতায়েন করা হয়েছে। রয়েছেন মহিলা পুলিশ সদস্যও। বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের অফিসের সামনে যাতে কেউ অশান্তি করতে না পারেন, এ জন্য এই আঁটসাঁট নিরাপত্তা।