প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে এই প্রথমবারের মতো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ১৪-দলীয় জোটের নেতারা। বৃহস্পতিবার (২৩ মে) রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা ২০ বছর আগে আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ১৪-দলীয় জোটের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা কতটা রয়েছে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে জানতে চান, কেন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের অপমান করা হলো? এরপরও কি ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজন রয়েছে বলেই তাদের ডাকা হয়েছে। বৈঠক সূত্র খবরের কাগজকে এ তথ্য জানিয়েছে।
জানা গেছে, ১৪ দলের জোটের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে জোট নেতাদের বঞ্চিত করার বিষয় নিয়েও। উপস্থিত নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অবমূল্যায়নের কথা। এ নিয়ে তারা তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এবং তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। তারা অবমূল্যায়নের অভিযোগ করেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বেশির ভাগ সময় কথা শুনেছেন। বৈঠকের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক চাপসহ নিষেধাজ্ঞার হুমকির বিষয়টি আসে। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা নিষেধাজ্ঞা দেবে তাদের সঙ্গে কোনো ব্যবসা করবে না বাংলাদেশ।
শুরুতে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে যে জোট হয়েছিল তা এখন ম্রিয়মাণ। কীভাবে তা কার্যকর করা হবে, তা ঠিক করতে হবে এবং এখন এই জোটের প্রয়োজন আছে কি? যদি প্রয়োজন থাকে তাহলে আগামীতে ১৪ দল কীভাবে চলবে?
হাসানুল হক ইনু বলেন, এক/এগারোর সময় আওয়ামী লীগের অনেকেই শেখ হাসিনার পাশে ছিলেন না। কিন্তু ১৪ দলের শরিকরা ছিলেন।
নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখতে কীভাবে মামলা করেছেন এবং অতীতে তার দলের অবদান তুলে ধরেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এই অবদান ভুলে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া গত জাতীয় নির্বাচনে কিংস পার্টির উত্থান নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি।
জানা গেছে, জোটের কয়েকজন নেতা শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, জোট গঠনের সময় কোন দলের ভোটব্যাংক বেশি এবং কোন দলের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো, সে বিষয়গুলো বিবেচনা করে জোট গঠন করা হয়নি। তাহলে কেন এখন এসব বিষয় নিয়ে কথা আসে? দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জনপ্রিয়তা এবং ভোটব্যাংক নেই- এমন অনেক দলের নেতা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অসহযোগিতার কারণে শরিক দলের অনেক নেতা নির্বাচনে পরাজিত হন।
নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, জোটের সাবেক সমন্বয়ক প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। আর বর্তমান সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু তো যোগাযোগই রাখেন না। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমির হোসেন আম্মু ও ওবায়দুল কাদেরকে শরিকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে বলেন।
বৈঠকে ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ না করে শরিকদের নিজ নিজ শক্তি বাড়ানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, শরিকরা শক্তিশালী হলে জোটের শক্তি বাড়বে।
শরিক নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৪ দলকে নিয়ে সামনে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। শরিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বৈঠক শেষে গণভবনের প্রবেশপথে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, জোটের দলগুলোকে আরও সংগঠিত এবং জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বৈঠকের পর ১৪ দলের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা থাকবে না বলে জানান ওবায়দুল কাদের।
এদিকে ফজলে হোসেন বাদশা খবরে কাগজকে বলেন, জোটের নেতারা নৌকা পেয়েও পরাজিত হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অসহযোগিতা করেছেন- এই বিষয়গুলো মেনন ভাই ও ইনু ভাই প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন। আজকের বৈঠকে ১৪ দল সামনে কীভাবে এগোবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া গেছে। ১৪ দল থাকলে সামনে কীভাবে কাজ করবে, এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।