পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ৭ উপায় । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ৭ উপায়

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৪, ০১:০৮ পিএম
পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ৭ উপায়
এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ

১) ভয়কে জয় করার মানসিকতা: নানা কারণ এবং সময়ে মানুষ ভয় পেয়ে থাকে। বিভিন্ন মানুষের ভয়ের কারণ আলাদা। একজন ছাত্র পরীক্ষায় খারাপ ফল করার ভয় পায়, একজন ব্যবসায়ী ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার ভয় পান, রাজনীতিবিদ ভোটে হেরে যাওয়ার ভয় পান, সিনেমার তারকা তার ছবি ফ্লপ হওয়ার ভয় পান। মানুষের প্রকৃতিই হলো নানা কারণে ভয় পাওয়া। কখনো ভূতের ভয়, কখনো অজানার ভয়, কখনো ব্যর্থতার ভয়, আবার কখনো প্রাণের ভয় মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই ভয়ের বসবাস আর কোথাও নেই। আর এই ভয়ই মানুষের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একবার যদি মন থেকে ভয় দূর করে ফেলা যায়, তাহলে কোনো কাজই আর মানুষের জন্য কঠিন নয়।

যেকোনো নতুন কাজ শুরু করার আগে সবাই ভয় পায়। কিন্তু ব্যর্থতার ভয় কখনো করা যাবে না বা কাজ কখনো অর্ধেক করে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। মন দিয়ে চেষ্টা করতে হবে, সাফল্য একদিন আসবেই। যে কাজটা করতে সবার ভয়, সেই কাজটাই বারবার করতে হবে। এটাই হলো ভয়কে জয় করার সবচেয়ে সহজ উপায়। ভয়কে কখনো জীবনের কাছাকাছি আসতে দেওয়া যাবে না। ভয় যদি কোনো কারণে কাছাকাছি চলে আসে, তবে এর ওপর আক্রমণ করতে হবে। অর্থাৎ ভয়ের থেকে পালিয়ে যাওয়া যাবে না, এর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। 

নিজের ভয়কে জয় করতে হলে অলস বসে থাকা যাবে না। নিজের মনকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। তাহলেই ভয় আর মনের মধ্যে আসতে পারবে না। যদি কারও মনে ভয় না লাগে, তার মানে এই নয় যে সে জিতে গেছে। যে বিষয়ে যার ভয়, তাকে জয় করাই হলো আসল সাহসের পরিচয়। বলা হয়ে থাকে, মনে ভয় না থাকলেই যে সেই ব্যক্তি সাহসী তা নয়, আসল সাহসী তিনি, যিনি নিজের ভয়কে জয় করেছেন। 

২) বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা: বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে। বই পড়ার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। আত্মোন্নয়নের জন্য বই পড়া জরুরি। বই পড়াকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে গড়ে তোলা উচিত। নিজেদের আত্মোন্নয়নের জন্য নিয়মিত বই পড়ার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
 
গতানুগতিক বইয়ের পাশাপাশি নিজের আত্মোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের বই পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মোন্নয়ন বই পড়লে একজন ব্যক্তির, চলাফেরা, আচার-আচরণ উন্নত করা সম্ভব। আত্মোন্নয়নমূলক বই পড়ে মানসিক হীনম্মন্যতা, বিষণ্নতা ও বদঅভ্যাস ত্যাগ করে সুন্দর জীবন গঠন করে অধিকতর সাফল্য অর্জন করা যায়।

নতুন কিছু শিখতে বা জানতে গেলে পড়াশোনার বিকল্প কিছু হয় না। পড়াশোনা মানে শুধু যে বই খুলে বসে পড়া এমনটা নয়, যে টুকু সময় পড়বেন সেটুকু সময় পড়ার মতো করেই পড়তে হবে। এর জন্য এখন অনেক স্মার্ট পদ্ধতি চলে এসেছে যেমন ইউটিউব, অ্যাপস, অনলাইন মক টেস্ট, কুইজ কনটেস্ট, quora ইত্যাদিসহ আরও অনেক উপায় আছে যেখান থেকে প্রয়োজন মতো জ্ঞান সংগ্রহ করা যায়। 

গতানুগতিক বই পড়ার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে একজনের মনের অবস্থা সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু আত্মোন্নয়নমূলক বই পড়লে একজন লেখকের মনের গভীরে জানা যায়। পৃথিবীতে বিখ্যাত ব্যক্তিরা নিয়মিত বই পড়তেন। তাদের মধ্যে ইলন মাস্ক, বিল গেটস, হিলারি ক্লিন্টন, জেফ বেজোস, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেপোলিয়ন প্রমুখ অন্যতম। 

৩) নতুন বিষয়ে জানার চেষ্টা করা: মনে একটু উৎসাহ আর সচেতনতা থাকলেই প্রতিদিন নতুন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে প্রতিদিন আশপাশে ও পৃথিবীতে কী ঘটছে সেটার বিষয়ে অবগত থাকা উত্তম। এ জন্য রোজ খবরের কাগজ পড়া বা ইউটিউবে কারেন্ট এফেয়ার্স ভিডিও দেখা ভালো। খবর পড়তে পড়তে দেখা যায় অনেক নতুন জিনিস ওঠে আসছে, যেগুলোর ব্যাপারে আগে থেকে জানা থাকে না। যদি একদিন কিছু পড়তে ভালো নাই লাগে, তাহলে নতুন গান শুনুন, কবিতা শুনুন। শুনতে শুনতে শিখে ফেলুন। 

সবচেয়ে ভালো হয় নিজে লেখার চেষ্টা করা। সময় পেলেই নতুন কোনো বিষয় উঠিয়ে নিয়ে তার সম্পর্কে অনুসন্ধান করা এবং সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ বা যেকোনো জায়গায় লেখালেখি করা। লিখলে জ্ঞান বাড়ে, নিজের কাছে নিজে পরিষ্কার হওয়া যায়। প্রতিনিয়ত যদি কিছু শিখতে হবে, নিজের কাজে মনোনিবেশ করলে দেখা যাবে পরনিন্দা বা পরচর্চা কিছু মনেই আসছে না। একটা কথা মনে রাখতে হবে, যত পরিশ্রম করবেন ততই জ্ঞান চক্রবৃদ্ধি সুদ আকারে বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং এর ফল হাতেনাতেই পাওয়া যাবে।

৪) খোলা মনে কথা বলা: নমনীয় এবং খোলা মনের হওয়া ভালো। অনমনীয় (Rigid) মনোভাবের মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেট করা কঠিন ও অস্বস্তিকর। আরেকজনকে বোঝার চেষ্টা, পুরোপুরি বিপরীত মত দেখেও হুট করে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সেটা নিয়ে ভাবা ভালো অভ্যাস। এটা আপনার কমিউনিকেশন স্কিল বাড়াবে, সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাবে, জ্ঞান বাড়াবে, সর্বোপরি নিজের ব্যক্তিত্ব মজবুত করবে। এসব ক্ষেত্রে সৎ থাকুন। নিজের জানায় বা ধারণায় ভুল খুঁজে পেলে সংশোধন করে ফেলতে হবে। আখেরে নিজেরই লাভ বেশি। খোলা মনের মানুষ হতে গেলে প্রচুর সময় দিতে হবে মানুষের সঙ্গে। ছোট-বড় সবার সঙ্গে মেশার কৌশলগুলো রপ্ত করতে হবে। যদিও সবার মন-মানসিকতা সমান হয় না; কিন্তু সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করা উত্তম।  

পরিবারের সদস্য, বন্ধু, সহকর্মী বা সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের ভালো বিষয়গুলো নিয়ে বা সাম্প্রতিক কোনো সাফল্য নিয়ে কথা বললে ভালো হয়। তাদের প্রশংসা করা, কৃতিত্ব দেওয়া, উৎসাহিত করার চেষ্টা করা। ইতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি কোনো বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনাও করা যেতে পারে, সে জায়গাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার বা উন্নতি করার পথও দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিছু কিছু সময় নিজের কোনো বিষয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকেও বিভিন্ন পরামর্শেরও প্রয়োজন হতে পারে।

৫) যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে তোলা: নেটওয়ার্কিং, কোলাবরেশন ও যোগাযোগ নতুন চিন্তা, নতুন কর্মপন্থা এবং নতুন সুযোগ তৈরি করে। নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্যভাবে যেকোনো ব্যক্তির সাফল্যকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজেকে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে রাখতে হবে যারা সবকিছুতেই অনুপ্রাণিত করতে পারে, সমর্থন করে এবং চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন লোকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, নতুন ধারণা শিখতে পারা যায় এবং বুঝতে পারা যায় কীভাবে যোগাযোগ করতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা করা যায় এবং এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হতে পারে। বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অথবা আগ্রহের বিষয়গুলোর সংক্রান্ত বিভিন্ন কনফারেন্স এবং ইভেন্টগুলোয় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে নেটওয়ার্কিং বাড়ে। 

অবশ্যই নেটওয়ার্কিং হতে হবে সৎ ও উদ্দেশ্যবহুল। চাকরির খোঁজা বা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রেফারেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব মানুষেরই সামর্থ্য রয়েছে এবং প্রত্যেকের নিজস্ব সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু যথাযথ যোগাযোগের অভাবে আরও ভালো একটি সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। তাই যোগাযোগের বা নেটওয়ার্কিং দক্ষতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রতি সপ্তাহে না পারলেও মাসে একবার হলেও পুরোনো বন্ধুদের খোঁজখবর নেওয়া, ক্যারিয়ার নেটওয়ার্কিং রিলেটেড সভা-সমিতিগুলোয় অংশ নেয়া যায়, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বন্ধু তৈরি হয়, অনুভূতি বা আইডিয়া প্রকাশের সময় যোগাযোগ দক্ষতা কাজে লাগানো যায় এবং সর্বোপরি- লিংকডইন ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। 

৬) নিজ পেশা সম্পর্কিত জার্নাল রাখা ও পড়া: প্রতিটি মানুষ তার পেশায় সাফল্যের রহস্য জানতে চায়। সব সফল মানুষের তেমন কোনো গোপনীয়তা নেই। তবে তাদের থাকে একটি পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো  কোনো সরঞ্জামগুলো প্রয়োজন তা জানার সঙ্গে সঙ্গে সঠিকভাবে প্রায়োগিক ক্ষমতা। নিজ পেশা-সম্পর্কিত জার্নালগুলোয় এ ধরনের অনেক অভিজ্ঞতা, সাম্প্রতিক বিষয়াবলি, প্রতিবন্ধকতা, উত্তরণের উপায়, সফলতার বাস্তব বিষয়গুলো জানা যায়। যা কর্মজীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। সেখানে নিজের অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা, লেখা বা প্রাসঙ্গিক অনেক কিছু শেয়ার করা যায়। তাই দৈনিক বা সাপ্তাহিক বা অন্তত মাসিক একটা জার্নাল হলেও রাখা প্রয়োজন। স্বীয় লক্ষ্য ও অগ্রগতি নির্ধারণ এবং তা মূল্যায়ন করতে জার্নালগুলো সহায়ক হতে পারে। 

৭) যোগ্য মেন্টর বা পরামর্শদাতা নির্বাচন: দ্য সাকসেস ফ্যাক্টর বইয়ে গবেষণার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে- অলিম্পিক বিজয়ী, নোবেল জয়ী, মহাকাশচারীসহ সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়া ব্যক্তিরা সব সময় মেন্টর বা পরামর্শদাতাদের দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখে। তারা জানে, একাই সাফল্য পাওয়া সম্ভব তাদের জন্য। কিন্তু এরপরও সাধারণের চেয়ে দূরে সরে গিয়ে একাধিক পরামর্শদাতার সঙ্গে নিজেদের সব সময় সম্পৃক্ত রাখে। যেকোনো ক্যারিয়ারে সাফল্য পেতে হলে যোগ্য পরামর্শদাতার দ্বারস্থ হতেই হবে। তারা প্রশংসা ও সমালোচনা, সমর্থন এবং চ্যালেঞ্জের একটা ভারসাম্য এনে দেবে। একজন পরামর্শদাতা সব সময়ই সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং ক্যারিয়ারে কখনো কর্মক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হলে প্রয়োজনীয় সাহায্য করতে পারবে। 

একজন পরামর্শদাতা তার জুনিয়রকে এমন সব চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত করবে, যেগুলোর কথা হয়তো আগে থেকে জানা যায়নি। যে ব্যক্তি বেশি সফল সে অবশ্যই অন্যান্য সফল ব্যক্তিদের চেনে, যারা অন্যদের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে। একজন মেন্টরের সাধারণত বলার মতো একটি নেটওয়ার্ক থাকে, যেটি ব্যবহার করে সে অন্যকে সাহায্য করতে পারবে। মেন্টররা জানেন এবং বুঝতে পারেন, কে বা কী একজন মানুষের ক্যারিয়ারকে লাইনচ্যুত করতে পারে। সেসবের কাছ থেকে রক্ষা করার উপায় বের করে দেয় মেন্টর। অনেক কাজই আছে যেগুলো প্রচারযোগ্য না, অনেক কাজই আছে যেগুলো ক্যারিয়ারে কোনো সুফল বয়ে আনবে না। সেগুলো থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে একজন পরামর্শদাতা। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে জটিল চরিত্রদের কীভাবে সামলাতে হয় সেটাও শিখিয়ে দেবেন মেন্টর।

হেড অব এইচআর, স্টার সিরামিকস লিমিটেড
[email protected]

মিসেস গুলশান আরা বেগম স্মরণে ‘তুমি হাসিছো কাঁদিছি মোরা’

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ০৮:২০ এএম
‘তুমি হাসিছো কাঁদিছি মোরা’
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আজ বিশ্ব মা দিবস। মা দিবসে আমি লিখি অনেকটা নিয়মিতই। গত বছরও মা দিবসে আমার লেখা ছিল। তখনও আম্মা জীবিত ছিলেন। আজ যখন এ লেখা লিখছি তখন মাহীন আমি ও আমরা। মিসেস গুলশান আরা বেগম (লিলি) (জম্ম: ১ ডিসেম্বর ১৯৬২; মৃত্যু: ১২ অক্টোবর ২০২৩) ব্যক্তিগত দুঃখবোধ থেকেই আমার এ লেখা। আমদের যে পরিবার, তা মাকে ঘিরেই আবর্তিত। আমরা পাঁচ ভাই-বোন। যেকোন শুভ-অসুভ কাজ আমরা মাকে ছাড়া করতে পারি না। আম্মা মারা যাওয়ার পর আমরা মনে হয় তাকে ছাড়া চলতে শিখতে শুরু করেছি। আমাকে ছাড়াই এবারের একুশে বইমেলায় আমার পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আম্মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট ভাই ইলিয়াস বিন কাশেম খুব অসুস্থ। আম্মার স্মরণে খুব কান্নাটি করে। প্রতিদিন সে আম্মা যে রুমে থাকতেন সে রুমে অফিস থেকে এসে নামাজ পড়ে একাকী মোনাজাত করে।

মায়ের সাথে তার যে আত্মিক বন্ধন তা প্রতিনিয়ত পোড়াচ্ছে। আম্মার মৃত্যুর আগে আমিও চরম অসুস্থতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি হলে আমি আম্মার শয্যা পাশে গিয়েছি নামে মাত্র। তার কোন সেবা শুশ্রম্নষা করতে পারিনি। 

আম্মাকে ছাড়া আমরা কোন সুন্দর মুহুর্ত চিন্তা করতে পারি না। অথচ আমরা তাকে ছাড়াই দিব্যি আছি।

কিডনি, ডায়বেটিস ও নানা রোগব্যাধীতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ রোগের সাথে যুদ্ধ করেছেন। তিনি পরাজিত হওয়ার মানুষ ছিলেন না। আম্মার জীবদ্দশায় তাকে নিয়ে লিখতাম। উনাকে সেগুলো পড়ে শোনাতাম বা উনি নিজেই পড়ে হাসতেন।

কতো শত অভিমান, আনন্দ আর হাসি গানে আমরা দিন পার করেছি। আব্বা যখন ১৯৯০ সালে মারা যান আমরা ভাই-বোনর তখন খুব ছোট। রাজধানী ঢাকার জীবন ছেড়ে আমাদের জায়গা হয় জীবন ঈশ্বরের এক অপরিসীম দয়া। জীবন-মৃত্যু যে কতো কাছাকাছি তা আমরা দেখি। আমাদের মায়ের মৃত্যু আমাদের সকলকে এই ভাবনা মনকে নাড়িয়েছে। মাঝে মােঝে মনে হয় বেঁচে থাকাটাই এখন আল্লাহর একান্ত কৃপা। আমাদের আনন্দ বেদনা সব সাঙ্গ হবে যখন আমরা শেষ হয়ে যাবো।  
কবির ভাষায় বলতে হয়,
‘প্রথমো যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে একা তুমি, হেসেছিলো সবে
এমনো জীবন তুমি করিবে গঠন
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন’
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শব্দ 'মা'

দুই.
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর শ্রেষ্ঠ লাইন ‘হেরিলে মায়ের মুখ/দূরে যায় সব দুখ।’ মা হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শব্দ। কি যাদুময় শব্দ ‘মা’। রক্ত শুষে নিরাপদে ধীরে ধীরে মায়ের গর্ভদেশে সন্তান বড় হয়।প্রতিটি মা সন্তানদের ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করে অসহনীয় যন্ত্রণা সুখ হিসেবে হাসি মুখে সহ্য করেন। জগতের আলো দেখানোর পরও তিল তিল করে মা-ই তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে একটু একটু করে বড় করে আগামীর সম্ভাবনাময় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে। 

প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। যদিও মা’কে ভালোবাসতে কোনো নির্দিষ্ট দিন লাগে না। তবুও সমস্ত ব্যস্ততাকে ছুটি জানিয়ে মায়ের জন্য একটি দিন বিশেষ করা যায়ই। মায়ের কাছে সব দুঃখ, কষ্ট, হাসি, গল্প কথা সবই কতো সহজে আমরা বলতে পারি। কারণ মা ই আমাদের জন্য আপনার চেয়েও আপন। সন্তানের জীবনে মায়ের অবদান অপরিসীম। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেও অন্তিম ছোঁয়া অসম্ভব। মায়ের গুরুত্ব বোঝাতে বিখ্যাত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বলেছেন। সমস্ত ধর্মেই মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হয়েছে। 

মহানবী হজরত মুহম্মদ (স.) বলেছেন, 'তোমাদের জন্য মায়ের পায়ের নিচেই রয়েছে তোমাদের জান্নাত।' অর্থ সম্পদের হিসাবে আমরা ধনী গরিবের হিসাব নির্ধারণ করি। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন আসল ধনী বলেছেন তাকে, যার মা আছে সে কখনই গরীব নয়। আমাদের প্রিয় মানুষেরা স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলেই আমাদেরকে ছেড়ে যান। কারো অপছন্দের সংজ্ঞায় একবার সংজ্ঞায়িত হলেই ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা করা হয় কিন্তু সন্তান হাজার অন্যায় করলেও মা ক্ষমা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেখক লুসিয়া মে অরকটের ভাষায়, 'মা সব কিছু ক্ষমা করে দেন। পৃথিবীর সবাই ছেড়ে গেলেও মা কখনো সন্তানকে ছেড়ে যান না।'

চারপাশে হাজার মানুষ থাকে। হাজার ঘটনাপ্রবাহ থাকে।বুদ্ধি জ্ঞান হবার তা আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু মায়ের সঙ্গ আমরা পৃথিবীতে আসার আগেই পায়। তাই মা ই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। 'আমি যা হয়েছি বা ভবিষ্যতে যা হতে চাই তার সব কিছুর জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী' আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন‌। নারীর জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা হয় মা হবার স্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে। কি অদ্ভুত সুন্দর একটা বিষয় যে একটা মায়ের থেকে আরেকটা নতুন মানুষ পৃথিবীতে আসছে। দারুণ ব্যাপার! অন্য কোনো কিছুতেই ভালোবাসার সুন্দর পরিমাপ সম্ভব হয় না যতটা অনুভব করা যায় মা হবার ফলে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ভাষায়, 'সব ভালোবাসার শুরু এবং শেষ হচ্ছে মার্তৃত্বে'। মায়ের বিশালতা হলো সুবিশাল প্রকৃতির মতো। উদারতায় মায়ের মন প্রাণ সুউচ্চ। সন্তানের সাফল্যে মায়ের প্রশংসা তৃপ্তির অনুভূতি যোগায়। আমেরিকান চিকিৎসক ও দার্শনিক ডা. দেবীদাস মৃধা বলেন,' মা হচ্ছেন প্রকৃতির মতো। যেকোন পরিস্থিতিতে তিনি তার সন্তানের প্রশংসা করেন'।

একজন আদর্শ মায়ের ক্ষমতা অনেক বেশি। তিনি সন্তানকে সঠিক দিক নির্দেশনায় সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দেয়ার সক্ষমতা পোষণ করেন। মায়ের পেটের এই সন্তান ই পৃথিবী শাসন করে। ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন বেনোপার্ট বলেছেন, 'আমাকে শিক্ষিত মা দাও। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমাদের একটা সভ্য, শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।'

প্রকৃতির অন্য প্রাণি কিংবা মানুষ সবার ক্ষেত্রেই এটি সত্য বাণী যে সন্তানের জীবন এবং সেই জীবনের সমৃদ্ধির জন্য মা আসলেই পুরোটা দিয়ে নি:স্বার্থভাবে করেন। সন্তানের জন্য মা নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেন। সন্তানের জন্য উদারতায় সুউচ্চ এক প্রাণি হলো মাকড়সা। ডিম ফুটে মাকড়সার বাচ্চা হয়। বাচ্চা না হওয়া অবধি সেই ডিম নিজের দেহে বহন করে  মা মাকড়সা। বাচ্চা হবার পর  তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাবারের প্রয়োজন হয়। মা মাকড়সা তখন নিজের শরীর বিলিয়ে দেয়। খাবারের জ্বালা মেটাতে বাচ্চা মাকড়সারা মা মাকড়সার দেহকে ঠুকরে ঠুকরে খেতে থাকে। সমস্ত কষ্ট আর যন্ত্রণা মা নীরবে সয়ে যায়। একটু একটু করে খেতে খেতে মা মাকড়সার পুরো দেহখানির গন্তব্য হয় তার সন্তানদের পেটের মধ্যে। বিশাল আত্মত্যাগের কারণে মাকড়সা ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা হিসেবে পরিগণিত।

তিন.
নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ' Give me a good mother I will give you a good nation.' আমাকে একটি ভাল মা দাও, আমি তোমাদের একটি ভাল জাতি দেবো। একজন মা-ই পারে তাঁর সন্তানদের আদর্শবান করে গড়ে তুলতে। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় সন্তানদের বাবা হয়তো থাকে জন্মদাতা হিসেবেই। সন্তানের লালন পালন, পড়াশোনা ও সার্বিক খোঁজ খবর মাকে-ই নিতে হয়। সন্তানের গতিপথ ও নব-নব সবই শেখে মায়ের কাছ থেকে। খুব ছোট বেলায় আমার মনে আছে যে আমি ভাবতাম আমার মা-ই বিশ্বের সব চাইতে জ্ঞানী মানুষ। অবশ্য বড় বেলায় এখনো আমার ভাবনা একই রকম রয়েছে। আমাদের সব ভাই-বোনের আজকের যে অর্জন সবই তাঁর কারণেই। 
আমার বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা ছিলেন সংসার বৈরাগী মানুষ। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কর্মকালীন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের করাচী থেকে দেশ মাতৃকার ক্রান্তিলগ্নে দেশে এসে সক্রিয় ভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং স্থানীয়দের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। আমার ফুপাতো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডার মোহাসীন ভাই এর কাছ থেকে শুনি বাবার গল্প। কিভাবে দেশে পালিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে আসছিলেন আর একজন সৈনিক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে কি করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি আবার বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে বিমান বাহিনী থেকে অবসর নেন। আমার বাবা বেঁচে থাকালীন সময়ে কখনো দেখিনি কারো সাথে বীরত্ব দেখাতে। সংসার বৈরগ্যের কারণে যতোদিন তিনি বেঁচে ছিলেন আমাদের নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিলোনা বল্লেই চলে। আমার বাবার বাড়ী নারায়ণগঞ্জ এর সোনারগাঁও এর কাজিরগাঁও গ্রামে। ১৯৯০ সালে আমার বাবা মোঃ আবুল কাশেম মৃত্যুবরণ করলে আমার মা আমাদের সব ভাই-বোন কে নিয়ে যশোরের কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামে নিয়ে আসেন। কেশবপুর উপজেলা শহরেও আমার নানার বাড়ী আছে। তবে তিনি সেখানে আমাদের রাখেননি যে আমরা বাজারের ছেলেদের সাথে মিশে বখে যাবো। 
রাজধানী ঢাকা থেকে মঙ্গলকোট গ্রামে এসে আমার মা অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়লেও আমাদেরকে কখনোই বুঝতে দেননি। প্রতিদিনই তিনি কাঁদতেন আমাদের অগোচরে। সেই সময় আমার মাকে আমি দেখেছি একদিকে তিন প্রচন্ড কড়া একজন মা, একজন সফল মালিক ও অভিভাবক। আমরা যে বাবাকে হারিয়ছি কখনো বুঝতে দেননি। বাবা থাকতেও আমরা যে আদর ভালবাসা পাইনি আম্মা তার সবটাই দিয়েছেন। বাবার পেনশন রেশন ইত্যাদির জন্য আমার বড় ভাইটাকে ও আমাকে নিয়ে যেতেন ঢাকাতে। আমার মায়ের খালু এক সময়ে যশোর-৬ এর সাংসদ গাজী এরশাদ আলী নানার মাধ্যমে একটি মালবাহী ট্রাক কেনা হয়েছিলো যা ট্রাক ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দেয়েছিলেন তিনি। আমার আম্মা প্রায় প্রতিদিনই কেশবপুরে নানার বাসায় যেতেন টাকা পয়সার হিসাব করতে। ছোট বেলায় আমার কখনো মনে পড়ে না আমাদের ভাই-বোন কাওকে তিনি টাকা আনতে পাঠিয়েছেন। তখন আমার নানার বাড়ীর গ্রামে জমিতে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হতো। সেগুলো আমাদের নানীর ভাগরাদার ছিলো তাদের দিয়েই বিক্রি করাতেন। পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটবে এ কারণে কখনো আমাকে বা অন্য ভাইদের বাজারে পাঠাতেন না। তবে আমার ছোট ভাইটা ভাল বাজার করতে পারতো বলে সে মাঝে মাঝে বাজার করতো বিকেলে। আমাদের সন্ধ্যার পরে কখনো বাড়ীর বাইরে যেতে দিতেন না। আজ আমরা যখন আমাদের সেসব দিনের কথা ভাবি মা অনকটাই আপ্লুত হয়ে পড়েন! গ্রামে আসার পর আমাকে গ্রামের বাড়ীর পাশে একটা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ভর্তি করিয়ে দিলেন আমার ছোট ইলিয়াস বিন কাশেম রাসেলকেও। আমার ছোট বোন ফারহানা তখন খুব ছোট স্কুলে যাওয়ার মতো বয়স হয়নি। প্রতিদিনই নিজে আমাদের পড়াতেন এবং কড়া শাসনের মধ্যে জীবন চলতে লাগলো। আমি সে বছর গ্রামের ওই প্রাইমারীর মধ্যে মাত্র তিন মাস পরাশোনা করে রেকর্ড সংখ্যক মার্কস পেয়ে স্কুল ফার্স্ট হই। ক্লাস থ্রী থেকে সরাসরি ক্লাস ফাইভে। আমরা তিন ভাই-বোন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী নিয়েছি।

আমাদের ৫ ভাই-বোনের মধ্যে চারজনই সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী। আমার বড় ভাই মুহাম্মদ বিন কাশেম জুয়েল রাজধানীতে ঠিকাদারী করেন করেন। বড় বোন ছামিয়া খাতুন গরুর ফার্ম গড়ে তুলেছন। ছোট ভাই ভাই ইলিয়াস বিন কাশেম স্কয়ার গ্রুপের মাছরাঙা টেলিভিশনে কাজ করছে। ছোট বোন ফারহানা আফরোজ ঢাকা ব্যাংক এ কর্মরত। আজ আমরা যে যেখানেই আছি সব কিছুর কৃতিত্ব আমার মায়ের-ই। আজ আম্মা নেই। তারপরও মরন হয় সব কিছু তার ইশারায় চলে। মা-ই আমাদের পৃথিবী। বিশ্ব নারী দিবসে এমন একজন মহিয়সী মাকে জানাই শ্রোদ্ধা, ভালাবাসা, সালাম। 

বিল্লাল বিন কাশেম
লেখক, কবি ও গল্পকার

রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ০৪:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা
ছবি : সংগৃহীত

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারা দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে-
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি॥’

জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে চাষিদের প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও পল্লীপ্রকৃতি সৌন্দর্যদৃশ্য ধ্বনির অপরূপরতার কাব্যিক বর্ণনা ‘আমার সোনার বাংলা’ কবিতায় স্পষ্ট দেখা যায়।

সময়টা ১৯৮০ সাল, দেবেন্দ্রনাথ তার কনিষ্ঠ ছেলে রবীন্দ্রনাথকে জমিদারির কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেন। তখনো রবীন্দ্রনাথের ওপর জমিদারির সব দায়িত্ব অর্পণ হয়নি। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর কঠোর শিক্ষানবিশির কাজ শেষে ১৮৯৫ সালের ৮ আগস্ট ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নির’ মাধ্যমে পিতা দেবেন্দ্রনাথের কাছ থেকে সমগ্র জমিদারি কর্তৃত্ব পান অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি জমিদার রূপে নিযুক্ত হন। জমিদার হয়ে রবীন্দ্রনাথ পুণ্যাহ উৎসব যোগ দিতে শিলাইদহে যান। সেখানে গিয়েই তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি তার পূর্বসূরিদের পথে হাঁটবেন না। উৎসবের শুরুতে ভাষণে বলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে। এটাই আমার সর্বপ্রধান কাজ’। মহাজন অর্থে ‘সাহা’ শব্দের ব্যবহার করেছেন, দরিদ্র প্রজা বলতে তিনি ‘শেখ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন কারণ তার জমিদারিতে অধিকাংশ প্রজাই দরিদ্র মুসলমান। দরিদ্র প্রজার অসহায়ত্ব তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। তাই তো বলেছেন-

‘সে অন্ন যখন কেহ কাড়ে,
সে প্রাণে আঘাত দেয় গর্বান্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে,
নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে-
দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে
মরে সে নীরবে। এই-সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে
দিতে হবে ভাষা- এই-সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা- ডাকিয়া বলিতে হবে-
মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে’

রবীন্দ্রনাথ তার জমিদারিতে পল্লী উন্নয়নের দিকে নজর দেন এবং বুঝতে পারলেন কৃষি খাতের আধুনিকীকরণ ছাড়া পল্লী উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষির উন্নতির জন্য রবীন্দ্রনাথের প্রচেষ্টা ছিল অভিনব। তিনি বুঝতে পারেন নতুন চাষের প্রবর্তনের মাধ্যমে গ্রামের আর্থিক অবস্থার উন্নতিসাধন করতে হবে। তাই শিলাইদহের কুঠিবাড়ি সংলগ্ন জমিতে নতুন ধরনের ধান চাষ, পাটনাই মটর, কপি চাষ শুরু করেন। ধান ও পাটের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অন্যান্য অর্থকরী শস্যের দিকে কৃষকদের দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করেন। তাই পরগণায় মাছ চাষ, আলুর চাষ, খেতের আলে কলা আনারস চাষে উৎসাহিত করেন। ১৯০৮ সালে এক কর্মীকে কবি চিঠিতে লিখেছিলেন- ‘প্রজাদের বাস্তুবাড়ি, খেতের আইল প্রভৃতি স্থানে আনারস, কলা, খেজুর প্রভৃতি ফলের গাছ লাগাইবার জন্য তাহাদের উৎসাহিত করিও। আনারসের পাতা হইতে খুব মজবুত সুতা বাইর হয়। ফলও বিক্রয়যোগ্য। শিমুল, আঙ্গুর গাছ, বেড়া প্রভৃতির কাজে লাগাইয়া তার মূল হইতে কিরূপে খাদ্য বাইর করা যাইতে পারে তাহাও প্রজাদিগকে শিখানো আবশ্যক। আলুর চাষ প্রচলিত করিতে পারিলে বিশেষ লাভের হইবে।’

রাজশাহীতে রেশমচাষের অবস্থা বেশ রমরমা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা এ দেশে চাষের উপযোগী করেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকে চিঠিতে লিখেন: ‘আমার চাষাবাসের কাজ মন্দ চলিতেছে না। আমেরিকার ভুট্টার বীজ আনাইয়াছিলাম। তাহার গাছগুলি দ্রুতবেগে বাড়িয়া উঠিতেছে।’

রবীন্দ্রনাথের কৃষি বিষয়ে প্রবল জ্ঞান ছিল বলেই যখন পতিসর ও শিলাইদহে সারের অভাব দেখা দেয়, এ অভাব মেটানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ একটি উপায় বের করেন। তখন বেশ কয়েক বছর থেকে পদ্মা নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে, বেড়াজালে একসময় এত মাছ ওঠে যে শিকারিরা নিতে চায় না। দেখা যায় ডিম বের করে নিয়ে নুন দিয়ে তা রাখছে আর মাছগুলো নদীর জলে ফেলে দিচ্ছে। নামমাত্র মূল্যে কৃষকরা নৌকাবোঝাই মাছ কিনে নিয়ে তা চুন দিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। এক বছর পর মাটি খুঁড়ে দেখা যায় চমৎকার সার হয়েছে। তখন মাছের সার প্রচলন করা হয়।

‘মানুষ যেমন একদিন হাল লাঙল, চরকা তাঁত, তীর ধনুক, চক্রবান যানবাহনকে গ্রহণ করে তাকে নিজের জীবনযাত্রার অনুগত করেছিল, আধুনিক যন্ত্রকেও আমাদের সেইরকম করতে হবে। যন্ত্রে যারা পিছিয়ে আছে, যন্ত্রে অগ্রবর্তীদের সঙ্গে তারা কোনোমতেই পেরে উঠবে না।’- ‘পল্লীপ্রকৃতি’ প্রবন্ধে এমন লেখা কৃষিভাবনার সুদূরপ্রসারী চিন্তার প্রতিফলন।

কৃষিকাজকে আরও বেগবান করতে ১৯০৬ সালে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও বন্ধু পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তার এক বছর পর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও ওই একই বিষয়ে শিক্ষালাভ করার জন্য আমেরিকায় পাঠান। রথীন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথের ব্যয়ভার বহন করতে স্ত্রীর গহনা, পুরীর বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত এই তিনজকে লেখেন: ‘তোমরাও দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজাদের অনুগ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ, ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণে যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলে এই ক্ষতি পূরণ হয়ে মনে সান্ত্বনা পাব। মনে রেখ এই টাকা চাষীর, এই চাষীরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধাপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে- এদের এই অংশ সম্পূর্ণ শোধ করার দায় তোমাদের উপর রইল।’

১৯০৯ সালে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরেন রথীন্দ্রনাথ। শুরু করেন পতিসরের মাটিতে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিকাজ। পতিসরের মাটিতে প্রথম ট্রাক্টর চাষাবাদ শুরু হয়, ট্রাক্টর চালান রথীন্দ্রনাথ নিজে। সে অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি লেখেন: ‘আমাদের দেশে তখনো ট্রাকটরের চলন হয়নি। ট্রাকটর তো পেলুম কিন্তু চালক পেলুম না। নিজেই চালাতে লাগলুম। কয়েকদিনের মধ্যে গ্রামের একটি ছোকরাকে চালানো শিখিয়ে দিলুম। হাজার হাজার লোক জমে গেল। ট্রাকটর নিয়ে আমি নেমে গেলুম ধান খেতে। তারা আশ্বাস দিল আপনি আলের ওপর দিয়ে চাষ দিয়ে যান, আমরা কোদাল নিয়ে থাকব, সঙ্গে সঙ্গে আল বসিয়ে নেব। ট্রাকটর দিয়ে চাষাবাদে কৃষকরা মহাখুশী।’

যে সময় মানুষ ব্যারিস্টারি, ডাক্তার ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য সন্তানদের বিদেশে পাঠানো হয়, জমিদার হয়েও রবীন্দ্রনাথ কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য তার নিজ পুত্রকে কৃষিতে শিক্ষা নিতে বিদেশে পাঠিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন চাষির একার পক্ষ্যে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব না। তাই ‘ভূমিলক্ষ্মী’তে বলেছেন, ‘আজ শুধু একলা চাষীর চাষ করিবার দিন নাই, আজ তাহার সঙ্গে বিদ্বানকে, বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হইবে।’
‘শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন,‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই-
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।

কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, ‘করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।
সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’

একজন জমিদার রবীন্দ্রনাথ কোনো এক ভূমিহারা কৃষকের হাহাকার তার মনোকষ্টের প্রকাশ ঘটিয়েছেন এমন ভাবেই ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ দরিদ্র কৃষকদের দুঃখ দুর্দশা বুঝতে পারতেন। কৃষকের হাহাকারের কারণ খুঁজতে গিয়ে ‘পল্লীপ্রকৃতি’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘জমিও পড়িয়া রহিল না, ফসলেরও দর বাড়িয়া চলিল, অথচ সম্বৎসর দুইবেলা পেট ভরিবার মতো খাবার জোটে না, আর চাষী ঋণে ডুবিয়া থাকে, ইহার কারণ কী ভাবিয়া দেখিতে হইবে। এমন কেন হয়- যখনই দুর্বৎসর আসে অমনি দেখা যায় কাহারো ঘরে উদ্বৃত্ত কিছুই নাই। কেন এক ফসল নষ্ট হইলেই আর এক ফসল না ওঠা পর্যন্ত হাহাকারের অন্ত থাকে না।’

তিনি দেখলেন দরিদ্র কৃষকদের কাছে অর্থ তো দূরের কথা, তারা সুদখোর মহাজনদের কবলে পড়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের আর্থিক সমস্যা দূর করতে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পতিসর কৃষি ব্যাংক। তখনো এই উপমহাদেশে লোন কোম্পানি বা ব্যাংক চালু হয়নি। বলা যায় পতিসর কৃষি ব্যাংক নতুন দিগন্ত। রবীন্দ্রনাথ এসব ব্যাংকের মূলধন সংগ্রহ করেন তার ধনী বন্ধুদের থেকে ধার করে। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে ঠাকুর পরিবারের অনেক সদস্য, আত্মীয়স্বজন টাকা জমা রাখেন। নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা তিনি পতিসর কৃষি ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন। এই ব্যাংক থেকে কৃষক শতকরা তিন টাকা হারে সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করত। ফসল ওঠার পর সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধ করে পরবর্তীতে আবার ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেত। এই পদ্ধতি চালু হওয়ায় চাষিরা মহাজনের চক্রবৃদ্ধি হারে সর্বনাশা সুদের কবল থেকে রক্ষা পেতে থাকল।

১৩১৪ বঙ্গাব্দে পাবনায় অনুষ্ঠিত জাতীয় মহাসভার প্রাদেশিক সম্মেলনে পল্লীর উন্নয়নের যে ১৫ দফা কর্মসূচি পেশ করেন তাতে ছিল আধুনিক কৃষি, কুটিরশিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ব্যাংক ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের এক সমবায়ভিত্তিক রূপরেখা। তার এই কাজে যুক্ত হন সমাজকর্মী কালীমোহন ঘোষ। পরবর্তীতে আসেন বিপ্লবী অতুল সেন। তার সহকারী হিসেবে ছিলেন উপেন ভদ্র, বিশ্বেশ্বর বসুসহ আরও অনেকেই। অতুল সেনের কাঁধেই কৃষি ব্যাংকের কাজে ভার পড়ে। এই কৃষি ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা ও প্রজাদের খাজনার সঙ্গে টাকা প্রতি এক আনা অতিরিক্তি অর্থ দিয়ে পতিসর, কমতা এবং রাতোয়ালে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হয়; যার উদ্দেশ্য দরিদ্র কৃষকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। একবার কালিগ্রামে মহামারিরূপে ওলাওঠা রোগ দেখা যায়। এই রোগ থেকে কৃষক ও প্রজাদের রক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ অতুল সেনকে চিঠি লেখেন- ‘আমি কয়েকটি ওলাওঠার ওষুধের বাক্স পাঠাইতেছি এবং যদি হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তার পাঠাইতে পারি, সেটা দেখবে।’

হোমিয়োপ্যাথি ঔষধের ওপর রবীন্দ্রনাথের ভরসা ও আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। রবীন্দ্রনাথকে লেখা শান্তি কবিরের একটা চিঠিতে বিষয়টি সহজেই জানা যায়। সেখানে ছিল- ‘সেবার বছর দুই আগে যখন শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম, তখন কথায় কথায় একদিন আপনি হোমিওপ্যাথি দিয়ে ভীষ্ণ সব রোগ কেমন করে আরোগ্য করেছেন, সে কথা বলেছিলেন। আপনি তো জানেনই আমাদের দেশে হোমিওপ্যাথদের কি দুর্দশা। সে সমস্ত কারণে আমরা চেষ্টা করছি যাতে বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির একটা কেন্দ্রীয় সঙ্ঘ করে বিধি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বন্দোবস্ত করা হয়’।

‘কিন্তু এবারে রাশিয়া ঘুরে এসে সেই সৌন্দর্যের ছবি আমার মন থেকে মুছে গেছে। কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা। আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট-পরিচয় হয়েছে। তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যহ ছিল দেখাশোনা- ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে। আমি জানি, ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে। ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে, সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছায়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয়’- রাশিয়ার চিঠিতে কবি এভাবেই চাষিদের দুঃখের কথা প্রকাশ করেন। তাই কৃষি ব্যাংক স্থাপন ও কৃষিতে উৎপাদন পদ্ধতির উন্নতির পাশাপাশি তিনি ভেবেছিলেন সমবায়নীতি ও কৃষিক্ষেত্র একত্রীকরণ ছাড়া গ্রাম্যকৃষি ব্যবস্থার অগ্রগতি সম্ভব না। রাশিয়ায় গিয়ে সেখানকার কৃষিব্যবস্থা, যৌথখামার ইত্যাদি দেখে রবীন্দ্রনাথ অভিভূত হয়েছিলেন।

‘চাষিকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে, এই ছিল আমার অভিপ্রায়। এ সম্বন্ধে দুটো কথা সর্বদাই আমার মনে আন্দোলিত হয়েছে- জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, সে চাষির। দ্বিতীয়ত, সমবায়নীতি অনুসারে চাপের ক্ষেত্র একত্র করে চাষ না করতে পারলে কৃষির উন্নতি হতেই পারে না। মান্ধাতার আমলের হাল লাঙল নিয়ে আলবাধা টুকরো জমিতে ফসল ফলানো আর ফুটো কলসিতে জল আনা একই কথা।’ রাশিয়ার চিঠিতে তিনি এভাবেই কৃষিতে সমবায়নীতির কথা তুলে ধরেন। তারপরই রাশিয়ার অনুরূপ কৃষিক্ষেত্রে একত্রীকরণের পরিকল্পনাও করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিকে একত্রিত করে সমবায়ের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের কাজে হাত দেন।

‘রাশিয়ার চিঠি’তে নির্দ্বিধায় বলেছেন ‘আমাদের দেশে আমাদের পল্লীতে ধান উৎপাদন ও পরিচালনার কাজে সমবায়নীতির জয় হোক, এই আমি কামনা করি’। কৃষিতে সমবায়নীতির একটা অংশ হচ্ছে কৃষকরা যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় এবং সহজে উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে পারে সে জন্য তিনি ‘ট্যাগোর এন্ড কোম্পানি’ নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালু করেন।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, কাজের সঙ্গে আনন্দের মিশ্রণ করলে কৃষকরা কর্মে উজ্জীবিত হবে। গান-বাজনাসহ বিভিন্নি অনুষ্ঠান আয়োজন করলে কৃষকরা কাজে অনুপ্রেরণা পাবে, আত্মশক্তি জাগ্রত হবে। তাই কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি গ্রামবাংলায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। সেসবের মাঝে ছিল গ্রামীণ মেলা, বাউল গান, যাত্রা, নাটক ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘গ্রামকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে হবে। সকলে শিক্ষা পাবে, গ্রামজুড়ে আনন্দের হাওয়া বইবে, গান-বাজনা-কীর্তন পাঠ চলবে, আগের দিনে যেমন ছিল’। তিনি জানতেন, কৃষকের মাঝে একতার জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিহার্য। তাই ‘কাত্যায়নী’ মেলা, ‘রাক-রাজ্যেশ্বরী’ মেলার আয়োজনসহ বৃক্ষরোপণ উৎসব, পৌষমেলা, মাঘোৎসব আয়োজন করেন। শিলাইদহ, পতিসর ও শ্রীনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। ১৯২৮ সালে হলকর্ষণ নামে একটি উৎসবের আয়োজন করেন। হলকর্ষণ মানে জমি চাষের উৎসব। ‘পল্লীপ্রকৃতি’ প্রবন্ধে এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলেন- ‘আজকার অনুষ্ঠান পৃথিবীর সঙ্গে হিসাব-নিকাশের উপলক্ষ নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবার, পৃথিবীর অনুসূত্রে একত্র হবার যে বিদ্যা মানবসভ্যতার মূলমন্ত্র যার মধ্যে, সেই কৃষিবিদ্যার প্রথম উদ্ভাবনের আনন্দস্মৃতিরূপে গ্রহণ করব এই অনুষ্ঠানকে।’ এইসব উৎসবে বিভিন্ন গান হয়। রবীন্দ্রনাথের লেখার সেসব গানেও কৃষি ও ফসলের কথাই উঠে আসে। যেমন:

‘আমরা চাষ করি আনন্দে।
মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে॥
রৌদ্র ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, বাঁশের বনে পাতা নড়ে,
বাতাস ওঠে ভরে ভরে চষা মাটির গন্ধে॥’

ফসল কাটার উৎসবে কৃষকদের উৎসাহিত করতে লিখেন :
‘আয় রে মোরা ফসল কাটি
বাদল এসে রচেছিল ছায়ার মায়াঘর,
রোদ এসেছে সোনার জাদুকর-
মোরা নেব তারি দান, তাই-যে কাটি ধান,
ও সে সোনার জাদুকর’
এমন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কৃষকদের একত্রীকরণ করে কৃষির উন্নতি ও সমবায়নীতি সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ার, লুকোচুরি খেলারে ভাই, লুকোচুরির খেলা। নীল আকাশে কে ভাসাল, সাদা মেঘের ভেলারে ভাই, সাদা মেঘের ভেলা’। কৃষি উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথের অবদান অসামান্য এবং অনুসরণীয়।

আদর্শ কৃষিক্ষেত্র সম্প্রসারণে তার বহুমুখী কর্মসূচি প্রশংসার দাবিরার। তিনি নিবিড়ভাবে অনুধাবন করতেন যে, কৃষক বাঁচলেই গ্রাম বাচবে। আর তাহলেই ‘গ্রামগুলো বেঁচে উঠবে এবং সমস্ত দেশকে বাঁচাবে’। তাই বলেছিলেন- ‘আমি একলা সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না, আমি কেবল জয় করব একটি বা দুটি গ্রাম। আমি যদি কেবল দুটি-তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা, অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরী হবে।’

রবীন্দ্রনাথের সে ভাবনাই আজ একুশ শতকে পৌঁছে বাংলাদেশে স্লোগান: ‘আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা: সীমাবদ্ধতা ও সংকট

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ০৬:৪১ পিএম
মত প্রকাশের স্বাধীনতা: সীমাবদ্ধতা ও সংকট
মো. আবদুন নূর দুলাল।

শুরু করি বাসন্তিকে দিয়েই। ১৯৭৪ সালের সেই জালপরা বাসন্তি। বাসন্তির ছবি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় দু'বার। ৩১ জুলাই, ১৯৭৪ প্রথম প্রকাশ। ইত্তেফাকের ভেতরের ক্রোড়পত্রে দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৭৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ছবিটি যিনি তুলেছিলেন তার নাম ফটোগ্রাফার আফতাব আহমেদ। যখন পত্রিকায় ছাপা হয় তখন ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন।

এই ছবিটি যে ভুয়া ছবি, সেই তথ্য উদঘাটিত হতেও সময় লেগেছে অনেক বছর। ছবিতে দু'জন নারী। একজন বাসন্তী, আর একজন বাসন্তীর চাচাতো বোন দুর্গাতি। জালপরা মেয়েটি বাসন্তী। সেই ছবি তোলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রাজো বালা। রাজো বালা জানান, ৭৪ সালে যখন বাসন্তী- দুর্গাতিদের ছবি তোলা হয় তখন বর্ষাকাল। চারিদিকে জল আর জল। তিনজন লোক আসে বাসন্তীদের বাড়িতে। একজন সেই সময়ের স্থানীয় রিলিফ চেয়ারম্যান আনছার। অপর দু'জনকে রাজো বালা চিনেন নাই। বাসন্তী- দুর্গাতিদের একটি কলাগাছের ভেলায় করে বাড়ি থেকে বের করা হয়। আর অন্য একটি ভেলায় করে তাদের ছবি তোলা হয়। বাঁধের উপর মাঝিদের জাল ছিল যা রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। সেই জাল এনে বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ির উপর পড়ানো হয়। বাসন্তির কাকা বুদুরাম আপত্তি জানান। বলেন ছেঁড়া হলেও একটা শাড়ীতো পরা আছে। তার উপর জাল পরানো দরকার কী? বাসন্তী ছিলেন এক বাকপ্রতিবন্ধী এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সেই নারীকেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার কাজে ব্যবহার করা হয়।

এই ছবি এবং ইত্তেফাকে তা প্রকাশ ছিল সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক ভয়াল জুচ্চুরি এবং এক কালো থাবা। এক জঘন্য প্রতারণা।

সেদিন কারও মাথায় আসেনি একটি জালের দাম একটি শাড়ির দাম থেকে কম নয়। সদ্য স্বাধীন একটি দেশে বাংলাদেশ নামক একটি যুদ্ধের ময়দানকে বিনির্মাণে যখন দিশেহারা বঙ্গবন্ধু, তখন এই সব বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ষড়যন্ত্র ও প্রোপাগান্ডা চলতে থাকে। চলতে থাকে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র। সব ষড়যন্ত্র এক হয়ে তৈরি করে ১৫ আগস্টের ভয়াল ট্রাজেডি। বাঙালি জাতিসত্তাকে ধংস করার এক ভয়ানক অপপ্রয়াস।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার এই নেগেটিভ উদাহরণ থেকেই এই লেখাটা শুরু করলেও আমি এবং আমরা কেউই মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী নই।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা কী?

সোজাসাফটা সরল অঙ্ক। আমার বাক স্বাধীনতা মানে আমি যা খুশ তাই বলবো। কাউকে তেল মারতে ইচ্ছা হলে উৎকটভাবে তেল মারবো। কাউকে গালি দিতে ইচ্ছে হলে নিজের ভাণ্ডারে যত কঠিন শব্দ আছে তা দিয়ে গালি দিব। নিজের ভাণ্ডারে ফুরিয়ে গেলে অন্যের কাছ থেকে ধার-দেনা করে কঠিন শব্দ জোগাড় করে গালি দিব। খাঁটি বঙ্গ ভাষায় গালি দিব। খাঁটি বঙ্গ ভাষা না কুলালে আঞ্চলিক ভাষায় গালি দিব। তাতেও না কুলালে ইংরেজী, উর্দু, আরবি, ফারসি, হিন্দি যে ভাষায় উৎকট শব্দ আছে সে ভাষা থেকে শব্দ চয়ন করে গালি দিব। এমন ভাষা প্রয়োগ করবো যাতে যাকে উদ্দেশ্য করে ভাষাটি প্রয়োগ হচ্ছে তার শ্রবণ শক্তি যেন ঝালাপালা হয়ে যায়। অন্তর যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যে শব্দটি তার কাছে সবচেয়ে কষ্টদায়ক সেই শব্দ দিয়েই তাকে জব্দ করবো। যে হাঁটতে পারে না- তাকে লেংলা বলে কষ্ট দিব। যে কথা বলতে পারে না- তাকে বোবা শয়তান বলে গালি দিব। যে নারী ডিভোর্সি- তাকে সেই প্রেক্ষাপট তুলে তুলোধুনা করবো। ভাল নারীকে কারণে বা অকারণে বেশ্যা বলে কলঙ্ক দিব। কেন দিব? কারণ এটা আমার বাক স্বাধীনতা। বাক স্বাধীনতা মানে আমার যা খুশি আমি তাই বলবো।

বাক স্বাধীনতা মানে কি এমন?

জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত ইউনিভার্সাল ডিকলারেশন অব হিউম্যান রাইটস এর ১৯নং আর্টিকেলে মানুষের বাক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার বিধান করা হয়েছে। সভ্যতার দাবিদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কনভেনশন ফর দ্যা প্রকেটশন অব হিউম্যান রাইটস এন্ড ফান্ডামেন্টাল ফ্রিডম এর ১০নং আর্টিকেলে বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তার বিধান করেছে।

এবার স্বদেশ প্রসঙ্গ

স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের দশ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়ন করে। রক্তের অক্ষরে লেখা সেই সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদ মত প্রকাশের তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত। এই অনুচ্ছেদে নিখুঁত ভাষায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা, ভাব ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি সংবাদপত্র এবং মিডিয়ার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। তবু আমাদের দিকে আঙ্গুল তোলে আমেরিকা। আঙ্গুল তোলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই বলে বিভিন্ন ফোরামে হইচই ফেলে দেয়। হইচই ফেলে দেয় বিভিন্ন মিডিয়ায়। মাঝে মধ্যে আমরাও তাদেরকে ডেকে এনে অযাচিত মন্তব্য করাই। কেন?

আঙ্গুল তোলার কারণ কি এই যে বাংলাদেশে আসলেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনুপস্থিত? নাকি কেবলই মোড়লিপনা?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সাদামাটা ভাষায় কিছু বিশ্লেষণ করি। মত প্রকাশের স্বাধীনাত কি অবাধ? সোজাসাপটা উত্তর- নিশ্চয়ই নয়। জাতিসংঘের ঘোষণা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কনভেনশনের সংশ্লিষ্ট অংশেই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত আছে এই অধিকারের সীমাবদ্ধতাসমূহ।

একটা উদাহরণ দেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কনভেনশনের আর্টিক্যাল ৮ হলো ব্যক্তিগত জীবনের অধিকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২নং অনুচ্ছেদ তার অনুরূপ। দু’টাই অধিকার। কোন অধিকার হতে কোন অধিকার ছোট নয়।

করিম একজন সাংবাদিক কিংবা ব্লগার। তার অধিকার আছে মত প্রকাশের। তিনি রহিম সম্পর্কে যা পেয়েছেন তা প্রকাশ করবেন অনায়াসে। অপরদিকে রহিমেরও অধিকার আছে ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখার। অধিকারের সঙ্গে অধিকারের দ্বন্দ্ব।

এ বিষয়ে ইউরোপীয়ান আদালত সমূহে অনেক মামলা আছে। অনেক যুগান্তকারী রায় আছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার এখানে সীমারেখা টেনে দেওয়া আছে। কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি কতটুকু বলতে পারবো তার সীমারেখা নিয়ে বিরোধ থাকলেও একটা সীমারেখা যে আছে তা নিয়ে কোন বিরোধ নেই।

এবার আদালত প্রসঙ্গ

আদালত হচ্ছে একটি শুভ্র চাদর। এতে দাগ লাগলে তা দেখা যায়। অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানে দাগ লাগলে যে রকম দেখা যায়, আদালতের গায়ে দাগ লাগলে দেখা যায় তার থেকে অনেক বেশি। সে জন্য আদালত নিয়ে আচার আচরণের এবং কথাবার্তার সীমারেখা তামাম দুনিয়াজোড়া স্বীকৃত। আমরা ছবি তুলি। ফটোসেশন করি। ফ্রি স্টাইলে করি। কিন্তু আমরা আদালতের ভেতরে ছবি তুলি না। কিংবা আদালতে বসা অবস্থায় মাননীয় বিচারপতির বা বিচারকের ছবি তুলি না। এটি হচ্ছে সীমারেখা।

আদালতে বিচারাধীন বিষয় সম্পর্কে আমরা কথা বলি মেপে মেপে। কারণ তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যে কোন কথা মাননীয় বিচারপতির দৃষ্টিগোচর হতে পারে। এবং তিনি তার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। কিন্তু নিস্পত্তিকৃত মামলা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করা বা মন্তব্য করা আমাদের অধিকার এবং তা আদালতে উৎকর্ষতা এবং মান বৃদ্ধির জন্য একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেখানেও সমালোচনা বা মন্তব্যের ভাষা হতে হবে শালিন এবং যুক্তিসংগত। আদালত হচ্ছে আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর একটি সীমারেখা।

এবার মানহানি প্রসঙ্গে দুটো কথা বলি। সকল মানুষের একটা মান আছে। ধনীর যেমন আছে, দরিদ্রেরও আছে। স্কুল শিক্ষকের যেমন মান আছে, ছাত্রেরও আছে। উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির যেমন মান আছে, নিম্ন পদের পিয়ন চাপরাশিরও মান আছে। মুসলিমের যেমন মান আছে, হিন্দুরও আছে। পুরুষের যেমন মান আছে, নারীরও মান আছে। মূল ভূখণ্ডের মানুষের যেমন মান আছে, উপজাতিয়দেরও মান আছে। সকলের মান তার কাছে গুরত্বপূর্ণ।

মান একটি সার্বজনীন অধিকার। যেমন বাক স্বাধীনতা একটি অধিকার। এখানেও অধিকারের সঙ্গে অধিকারের দ্বন্দ্ব এবং বাক স্বাধীনতার আরেকটি সীমাবদ্ধতা। এগুলো হচ্ছে বাক স্বাধীনতার আইনী এবং যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা। কিন্তু বাস্তবতার কষাঘাত বড়ই নির্মম। সাংবাদিক লড়াই করে মানুষকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সরবরাহের জন্য। আঘাত আসে সামরিক জান্তার বুলেট আর বেয়নেট থেকে। স্বৈরাশাসকের বন্দুক থেকে। বড় এবং ছোট কিছিমের মাস্তান থেকে। আঘাত আসে সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিদের আস্তানা থেকে।

হুমায়ুন আজাদ, অভিজিতসহ কত কত জন জঙ্গি হামলার শিকার। তাদের অপরাধ তারা মুক্ত চিন্তার মানুষ। আবার অঢেল টাকার এক মালিকের বিরুদ্ধে একবারতো সকল প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া সীমাহীন নীরবতা পালন করে। আবার একজনের উদ্যত বাক দমিয়ে দেয় আরেকজনের বিনম্র বাক। মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে যেয়ে পৃথিবীর বাঁকে বাঁকে ঝরে গেছে কতো কতো অকুতোভয় প্রাণ। আবার মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন কত সাধুকে চোর বানায়, কতো সম্ভ্রান্ত মানুষকে অকারণে লাঞ্চিত করে। একই মুদ্রা, এপিঠ ওপিঠ।

সংবাদ বিরুদ্ধে গেলে নিপীড়িত হয় সাংবাদিক। আবার অসাধু কলমের খোঁচায় বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার আঘাতে দিগন্তজোড়া অবয়ব নিয়ে দাঁড়ানো ভালো মানুষ নিমিষেই ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়। এখনতো কেবল সাংবাদিকরাই নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রল করে, ভাইরাল করে মিথ্যাকে। ভাইরাল করে গুজবকে। জীবিত ব্যক্তিকে অনায়াসে মেরে ফেলে।

অবাধ তথ্য প্রবাহ

কোন কোন সুশীলকে দেখি সকাল থেকে গভীর রাত অবধি মিটিং মিছিল টকশোতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে শেষমেষ বলে কথা বলতে পারছি না, বাক স্বাধীনতা নেই। তবু শেষ অনুভূতি ব্যক্ত করি।

চাই অবাধ তথ্য প্রবাহ

কোন অবস্থাতেই অন্যের সর্বনাশ করে নয়। নিজ ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের মাধ্যমে নয়। দুনিয়াজোড়া বিবেদ হানাহানি সৃষ্টি রক্তপাত করার জন্য নয়। যুদ্ধের উসকানি দেওয়ার জন্য নয়। জাতির জনককে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য নয়। অবাধ তথ্য প্রবাহ চাই। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। সভ্যতার জন্য। কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি মানবিক পৃথিবী সৃষ্টির জন্য। তবেই হবে মুক্তচিন্তা শব্দটির প্রকৃত স্বার্থকতা।

লেখক: মো. আবদুন নূর দুলাল, সদ্য সাবেক সম্পাদক- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি

যুক্তরাষ্ট্র এখন কী জবাব দেবে?

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ০৩:৪৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র এখন কী জবাব দেবে?
মো. সাখাওয়াত হোসেন

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহতের ঘটনার জবাব চেয়েছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতি হয়নি উল্লেখ করে দেশটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তারও সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রে চলা ইসরায়েলবিরোধী মিছিলে পুলিশের হামলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর মানবাধিকার রিপোর্ট লেখে কিন্তু আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে না। এ ছাড়া জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে কাজ করে যাচ্ছে কিংবা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দিচ্ছে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্রবিক্ষোভে পুলিশের হামলার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই দেশে মানবাধিকার কতটুকু আছে সেটাই প্রশ্ন। কথা বলার স্বাধীনতা কতটুকু আছে সেটাই প্রশ্ন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার কতটুকু আছে সেটাই প্রশ্ন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের বাঙালি মারা গেছে। সেই দিনও দুজন মারা গেল। আমি প্রতিবাদ জানাই। তারা জীবন-জীবিকার জন্য গেছে। কিন্তু তাদের এভাবে হত্যা করবে কেন? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি।’ বাচ্চা ছেলেও তাদের হাত (যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ) থেকে রেহাই পায় না উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘যারা এখন মানবাধিকারের গীত গায় এবং বাংলাদেশের মানবাধিকার খুঁজে বেড়ায়, তারা কী জবাব দেবে। আমি সেই জবাব চাই। মানবাধিকার সংস্থা, বিচার বিভাগ, যারা আমাদের নিষেধাজ্ঞা দেয়, আমাদের ওপর খবরদারি করে তাদের কাছে জবাব চাই।’

যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালি কেন মারা যাবে, এ প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘ওইরকম মায়ের কোল থেকে নিয়ে হত্যা করা, শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন করা এটা তো সম্পূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করা।’ গত মার্চে নিউ ইয়র্কের কুইন্সে পুলিশ উইন রোজারিও নামে এক বাংলাদেশি তরুণকে গুলি করে হত্যা করে। সে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। পুলিশের অভিযানের সময় মা তাকে কোলে আগলে রেখেছিল। এ ঘটনার পর উইনের পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কের বাফেলো শহরে দুই বাংলাদেশিকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার। বিশ্বের কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়ে কথা বলবার চেষ্টা করে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করে থাকে। এটি খুবই ইতিবাচক ও প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ইদানিং দেখা যাচ্ছে যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন; লক্ষ্য করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতিতে ওইসব দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মারাত্নক আকার ধারণ করে থাকে। আবার যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয় সেসব দেশে সহিংস ঘটনার অবতারণা হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেসব আমলে নিচ্ছে না। মায়ানমারের সামরিক জান্তা কর্তৃক জাতি নিধনের ঘটনার পরেও যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করে। আবার ফিলিস্তিনে ইসরায়েল কর্তৃক শিশু ও নারী হত্যার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের পাশাপাশি ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞকে প্রকারান্তরে সমর্থন প্রদান বাকি বিশ্বের শান্তিকামী জনতা কেউই মেনে নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আত্নরক্ষার স্বার্থে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এ ধরনের অজুহাত ও অদ্ভুত যুক্তি আমাদের হচকচিত করেছে, স্তম্ভিত করেছে। এমন বিবেকহীন বিবৃতি ইসরায়েলকে আরও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছে, ক্ষণে ক্ষণে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের খড়গ অব্যাহত রেখেছে। অথচ বাকি পৃথিবী ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে এর ওপর মামলাও হয়েছে।

এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও সমাদর নিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্ষোভ ও ঘৃণা দেখা দিয়েছে। মায়ানমারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে একেবারে নিধন করে দিয়েছে মায়ানমারের সামরিক জান্তা এবং সেখানে মৌন সমর্থন ও সম্মতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট যেখানে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে সেই জায়গায় তারা কোনোভাবেই সমাধানে উদ্যোগী না হয়ে উল্টো মানবাধিকার লঙ্ঘনকেই মৌন সমর্থন প্রদান করে। আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারে ও সাম্রাজ্যবাদ নীতি প্রতিষ্ঠায় শুরু থেকেই তৎপর ছিল এবং এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যু ও স্পর্শকাতর বিষয়ে দ্বি-পাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের সূত্র ধরে মোড়লগিরি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে অব্যাহতভাবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে প্রকারান্তরে সাম্রাজ্যবাদের নীতিকে প্রতিষ্ঠা করার একটি অঘোষিত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তারা তাদের পরিকল্পনা মতো এগিয়েছে। যদিও বর্তমান সময়ে তাদের গৃহীত ও ঘোষিত বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে সহজেই অবগত হয়েছে। আবার অনেকেই এমনও বলে থাকে পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদকে জিইয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ততাকে দায়ী করে থাকেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন বিশ্বব্যাপী অনেকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। গবেষকরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এ সংস্থার তথ্য উপাত্ত মূল্যায়ন করে গবেষণা কার্য সম্পাদনের চেষ্টা করে থাকেন। কিছুদিন আগে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের যুদ্ধের ওপর এ সংস্থাটির দাখিল করা প্রতিবেদনে ব্যাপক পক্ষপাতিত্বের স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। বিশেষ করে গবেষণা সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও ইসরায়েলের সরকারের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ফিলিস্তিনের ভুক্তভোগীদের কোনোরূপ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট বের হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সমালোচনার ঝড় উঠে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিশ্বব্যাপী সব দেশের মানবাধিকার সংক্রান্ত জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার নিয়ে তেমন বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে আসে না কিংবা ইচ্ছে করেই প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। এটি এক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র ও অবস্থানকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক লক্ষণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরলেও নিজের দেশের মানবাধিকার নিয়ে একেবারেই উদাসীন। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত বিরতিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে, পুলিশের হেফাজতে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে। মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, তথাপি সরকার কিংবা রাষ্ট্র এসবের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করে বলেছেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে নিজ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করুন। তিনি বলবার চেষ্টা করেছেন, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থনের কারণেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার তেমন আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেখা যায়, এ যুদ্ধের কারণে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের বোধোদয় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে নিজ দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, জানমালের সুরক্ষা, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতি বজায় রাখা, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া। সর্বোপরি বর্ণ, গোত্র বৈষম্যের ব্যবধান গুছিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিতে কাজ করে যাওয়া।

কিছু দিন পর পর সংবাদমাধ্যমের বরাতে শোনা যায়, বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তী সংবাদে প্রতিকারমূলক কোনোরূপ ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য অর্জনের সংবাদ আমাদের গোচরীভূত হয় না। এর মানে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি রয়েছে, তা না হলে যে সংবাদমাধ্যমের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সংবাদ সম্বন্ধে আমরা জেনে থাকি সেই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে পরের সংবাদটুকুও প্রচার করা। যেহেতু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে কোনো সংবাদ গোচরীভূত হয়নি সেহেতু ধরে নেওয়া যায় এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হচ্ছে না। তাহলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নীরবে নিভৃতে বিচারের বাণী ক্রন্দনে পর্যবসিত হয়ে থাকে। আমরা মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাদের দেশে অভিবাসী হয়ে যারা গমন করছে কিংবা তাদের দেশের স্থায়ী নাগরিক তাদের প্রত্যেকের মানবাধিকার নিশ্চিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া। কেননা রাষ্ট্রের মূল এবং মৌলিক কাজ হচ্ছে নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া এবং অধিকার নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মানবিক চিকিৎসক ডা. সাহিদা আখতার : শিশুদের বন্ধু, সমাজসেবক এবং গবেষক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ০৩:০৪ পিএম
মানবিক চিকিৎসক ডা. সাহিদা আখতার : শিশুদের বন্ধু, সমাজসেবক এবং গবেষক
ড. মতিউর রহমান

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০২১ সালের ১ মে সন্ধ্যায় আমাদের সবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার চিরতরে বিদায় নিয়েছিলেন। কয়েক মাস ধরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার ফুলার রোডের বাসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের চিকিৎসাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষক, গবেষক এবং মানবিক চিকিৎসক। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ও চিকিৎসাসেবার উন্নতিতে উৎসর্গ করেছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তার ছাত্রছাত্রীরাও তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত।

ডা. সাহিদা আখতার বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। নবজাতক শিশুদের জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এবং তাদের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার মানবিক মনোভাব ও সহানুভূতির জন্য তিনি শিশুদের মাঝে ‘শিশুদের বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তিত্ব। রোগীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ও সহানুভূতি তাকে সবার কাছে সমাদৃত করে তুলেছিল। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসায় তিনি সর্বদা সাহায্য করতেন এবং তাদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাও দিতেন।

ডা. সাহিদা আখতার ১৯৬১ সালে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারীতে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পর্যায়েই তিনি তার অসাধারণ মেধা ও কৃতিত্বের মাধ্যমে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন এ কলেজের পঞ্চম ব্যাচের একজন ছাত্রী।

এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর ডা. সাহিদা আখতার বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস ও সার্জনস থেকে এফসিপিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি পেশাগত উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন খ্যাতিমান শিশুবিশেষজ্ঞ, যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় শিশুদের সুস্থতা ও কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক এবং বারডেম জেনারেল হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিশুবিশেষজ্ঞ হিসেবে সেখানে কর্মরত ছিলেন।

ডা. সাহিদা আখতার
ডা. সাহিদা আখতার

শুধু ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও বারডেম হাসপাতালেই নয়, ডা. সাহিদা আখতার দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল (অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন, ইন সার্ভিস ট্রেইনি); ঢাকা শিশু হাসপাতাল; আইপিজিএমআর (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়); ডা. কাশেমস ক্লিনিক ও হাসপাতাল, কুষ্টিয়া; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (লেডি ডাক্তার), ইত্যাদি।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন দেশের একজন প্রখ্যাত শিশুবিশেষজ্ঞ, যিনি তার জীবনের প্রায় তিন দশক নবজাতক শিশুদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন দেশের নবজাতক স্ক্রিনিং টেস্ট প্রোগ্রামের একজন পথিকৃৎ, যা শিশুদের জন্মের পরপরই নির্দিষ্ট কিছু বংশগত রোগের জন্য পরীক্ষা করে।

নিউবর্ন স্ক্রিনিং টেস্ট হল জেনোমিক মেডিসিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যা শিশুদের জন্মের পরপরই কিছু গুরুতর বংশগত রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এই রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেনাইলকেটোনিউরিয়া (PKU), হাইপোথাইরয়েডিজম এবং অ্যাড্রেনাল কনার্টিকাল হাইপারপ্লাসিয়া (CAH)। যদি এই রোগগুলো শিশুদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা হয় এবং চিকিৎসা করা হয়, তবে তাদের সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনযাপন করা সম্ভব।

ডা. সাহিদা আখতার বাংলাদেশে নবজাতক স্ক্রিনিং টেস্ট প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি এই প্রোগ্রামের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবং এর ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কাজ করেছিলেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে, বাংলাদেশে নবজাতক স্ক্রিনিং টেস্ট একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রোগ্রামে পরিণত হয়েছে যা প্রতি বছর লাখ লাখ শিশুর জীবন রক্ষা করছে।

ডা. সাহিদা আখতার শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ, হাঁপানি, বুকের দুধ খাওয়ানোর অনুশীলন, নবজাতকের প্রয়োজনীয় যত্ন, জন্মের সময় নবজীবন সঞ্চার, উন্নত কার্ডিয়াক লাইফ সাপোর্ট, এইচবিবি (শিশুদের শ্বাস নিতে সহায়তা করা), ইসিডি (প্রাথমিক শৈশব বিকাশ), পিএনডিএ (পেরিনিটাল ডেথ অডিট) ইত্যাদি বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এই জ্ঞান ও দক্ষতা তার চিকিৎসা অনুশীলনে প্রভাব ফেলেছিল এবং তাকে শিশুদের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

শিশুদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের উন্নতিতে অবদান রাখার জন্য ডা. সাহিদা আখতার শুধু চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোতে তার গবেষণা কাজও উল্লেখযোগ্য ছিল। তার গবেষণা ফলাফল শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা ব্যতীতও তিনি ছিলেন একজন সচেতন সমাজ গবেষক। দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন এবং মৌলিক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন। তার রচিত মৌলিক গবেষণা ও সেমিনারে/ওয়ার্কশপে উপস্থাপিত ও প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৫০-এর বেশি।

ডা. সাহিদা আখতার নিরলস পরিশ্রম করেছেন নবজাতক শিশুদের রোগাক্লান্ত মুখে হাসি ফোটাতে। তিনি কেবল চিকিৎসায়ই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নিয়মিত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও সদাসক্রিয় ছিলেন। শিশুদের ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মাতৃদুগ্ধপানে মায়েদের উদ্বুদ্ধকরণ সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে তার বিশেষ অবদান ছিল।

শিশুস্বাস্থ্যের নানা বিষয় ছাড়াও একিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন, এন্ডোক্রাইনোলজি এবং জিনোমিক্সও ছিল ডা. সাহিদা আখতারের আগ্রহের জায়গা। নিওনেটোলজি, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, জেনেটিকস, জিনোমিক মেডিসিন, মা ও শিশু মৃত্যু এবং অসুস্থতা, শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যের সামাজিক মাত্রা, পানীয় জলে আর্সেনিক প্রশমন-সনোফিল্টার ইত্যাদি বিষয়েও তিনি কাজ করেছেন।

ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। তিনি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে এ দেশের গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তিনি বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন (দায়িত্ব গ্রহণের আগেই মৃত্যুবরণ করেন)। এ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত সহসভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরামের নির্বাচিত সহসভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ পেরিনেটাল সোসাইটির নির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, বাংলাদেশ অ্যাজমা অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের জীবন সদস্য, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের জীবন সদস্য, ইয়ং ডায়াবেটিক ওয়েলফেয়ার সোসাইটির জীবন সদস্য। এসব সংগঠনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এ দেশের শিশু চিকিৎসা শাস্ত্রকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

ডা. সাহিদা আখতারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ। তিনি বিখ্যাত গবেষক ও অর্থনীতি শাস্ত্রের অধ্যাপক আবুল বারকাতের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তিনি শুধু একজন স্ত্রীই ছিলেন না, বরং একজন সঙ্গী, বন্ধু এবং সহকর্মীও ছিলেন। তাদের তিন কন্যা সন্তান রয়েছে।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন মানবিক এবং বিনয়ী ব্যক্তিত্ব। রোগী, শিক্ষার্থী, সহকর্মী- সবার কাছেই তিনি ছিলেন সম্মানিত ও প্রিয়। তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক যিনি তার ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করেছেন এবং তাদের ভালো চিকিৎসক হতে সাহায্য করেছেন।

তার মৃত্যুর পর অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতারের স্বামী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের সম্পাদনায় ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী ‘অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার একজন শিশুচিকিৎসকের যাপিত জীবন’। যে কেউ এ জীবনীগ্রন্থ পড়ে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন ও অনুপ্রাণিত হবেন।

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার চলে গেলেও তার অবদান ও স্মৃতি আমাদের অন্তরে চির অমলিন হয়ে থাকবে। একজন দক্ষ শিশুবিশেষজ্ঞ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আমাদের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তার আত্মার শান্তির জন্য আমাদের সবার প্রার্থনা।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
[email protected]