ঢাকা ৫ শ্রাবণ ১৪৩১, শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪

বঙ্গমাতার উদ্বাস্তু জীবন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫২ পিএম
আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫২ পিএম
বঙ্গমাতার উদ্বাস্তু জীবন
ইশতিয়াক আলম

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সারা দেশে সাময়িক আইন জারি করা হয়। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ অভ্যুত্থানে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।...

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আওয়াসী লীগ ও ছাত্র নেতাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে রাতে বেগম মুজিবের সঙ্গে থাকেন দুই ছেলে শেখ রাসেল ও শেখ কামাল। শেখ কামাল বিদায় নিয়ে সেই রাতে ও তারপরে কয়েকদিন ঢাকায় অন্য কোথাও থাকেন।

জামাতা ড. ওয়াজেদ, সন্তানসম্ভবা হাসিনা (২৪) এবং তার ১০ বছরের ছোট বোন রেহানা এবং এ টি এম সৈয়দ হোসেনের (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ বোন খোদেজা বেগম লিলির স্বামী) মেয়ে জলীকে নিয়ে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডের এক ভাড়াটিয়া বাড়িতে থাকেন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ২৯ মার্চ নেওয়া হয় পাকিস্তানে। 

২৫ মার্চ রাতে বেগম মুজিব দুই ছেলে জামাল ও রাসেলকে নিয়ে ৩২ নম্বর বাড়িতে কাটান। পরদিন ২৬ মার্চ সারা দিন কারফিউ থাকায় তাদের একইভাবে দিন ও রাতেও ওই বাসাতেই কাটাতে হয়। তখন শেখ মুজিবুর রহমানের মেজো ফুপু আছিয়া বেগমের  ছেলে মমিনুল হক খোকা থাকতেন মোহাম্মদপুরের বাসায়। 

সেদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাতে একে একে সবাই যখন বিদায় নিয়ে চলে যান তখন হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিব এবং খোকাকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলেন, ‘শোন, আমি জানি না আমার ভাগ্যে কী হতে যাচ্ছে। খোকা রইল, ও তোমাদের দেখবে।’ স্ত্রীকে এ কথা বলে খোকাকে বললেন, ‘খোকা তোর ওপরই ছেড়ে দিলাম ওদের ভার।’

২৭ মার্চ খোকা মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে লালমাটিয়ার ভেতর দিয়ে এ বাসা-ও বাসা হয়ে ৩২ নম্বরে পৌঁছান। নিচ তলার সিঁড়িতে দেখতে পান বেগম মুজিব এবং রাসেল ও জামালকে। খোকাকে দেখে বেগম মুজিব হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘আমরা এখন কোথায় যাব।’

খোকা তাদের সান্ত্বনা জানিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে আসার কথা বলে বাইরে আসেন। এই সময়ে একটা গাড়ি এসে থামে তাদের সামনে। গাড়ির চালক কামালের বন্ধু তারেক। গাড়িতে তারা চারজন (খোকা, বেগম মুজিব এবং রাসেল ও জামালসহ) ধানমন্ডির দুই নম্বর রোডের খোকার বন্ধুও আত্মীয় মোরশেদ মাহমুদের বাসায় যান। বাসার লোকজন তখন বাক্সপেঁটরা গুটিয়ে বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খোকা কালরাত ২৫ মার্চ নিজের বাসায় যাওয়ার আগে তার গাড়িটি জাকি ভাইয়ের ২ নম্বর রোডের বাসায় রেখে গিয়েছিল। তখন খোকা বেরিয়ে নিজের গাড়িটি নিয়ে এসে মিসেস মুজিব, রাসেল ও জামালকে নিয়ে নিজের গাড়িতে ওঠেন। কিন্তু কোথায় যাবেন? কারফিউ শিথিল করা হয়েছে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। লোকজন প্রাণভয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য ছুটছে। খোকা গাড়ি নিয়ে আসেন ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডে বন্ধু ক্যাপ্টেন রহমানের বাসায়। জাকি ভাইয়ের বাসা থেকে খোঁজ পেয়ে শেখ কামাল এবং শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা আসেন দেখা করতে। ক্যাপ্টেন রহমান ব্লেড দিয়ে তাদের দুজনকে (শেখ কামাল এবং আমিনুল হক বাদশকে) গোঁপ কামিয়ে ফেলতে পরামর্শ দেন। ক্যাপ্টেন রহমান সরকারি কর্মকর্তাবলে তাকে অফিসে যেতে হবে বলে অফিসে রওনা হন। যাওয়ার আগে গোপন কথা বলার মতো করে জানান, তিনি পরিবার নিয়ে লঞ্চে ভারতে চলে যাবেন, সে ব্যবস্থা হয়েছে।

খোকা ঠিক করেন ওয়ারীতে তার শ্বশুরবাড়িতেই যাবেন। বেগম মুজিব বলেন, ধানমন্ডি ১৫ নম্বর রোডে ভাড়া বাসায় রয়েছে রেহানা, জলি  ও হাসিনা। ২৫ মার্চের সন্ধ্যার পর থেকে তাদের কোনো খোঁজ জানেন না। অগ্যতা ওয়ারী যাওয়ার আগে খোকা যান তাদের দেখতে। গিয়ে দেখেন বাসায় শুধু রেহানা রয়েছেন। 

খোকা তার ইচ্ছায় তাকে নিয়ে ফিরে এসে সবাইকে নিয়ে ওয়ারীর উদ্দেশে রওনা দেন। রাস্তায় সন্ত্রস্ত মানুষের মিছিল। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে বুড়িগঙ্গার দিকে। আবার কারফিউ হওয়ার আগে নদীর ওপারে পৌঁছতে চায় সবাই। মগবাজারের চৌরাস্তা পার হওয়ার সময় গোলাবর্ষণের আওয়াজ তাদের কানে আসে। সকাল থেকে কম ঘোরাঘুরি হয়নি। বেলা হয়েছে, কারফিউ বিরতির ভেতর ওয়ারী পৌঁছানো যাবে না ভেবে মগবাজারের এক গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে ওঠেন সুপারিনটেন্ড্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আলী সাহেবের বাড়ির এক রুমে। এখানে দেখা পান চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির, অভিনেতা সিডনি, ধানমন্ডির মোরশেদ মাহমুদ, মগবাজারের খায়ের সাহেবের মতো পরিচিতজনদের। অনেকগুলো খারাপ খবর পান, শহিদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগরতলা মামলার প্রধান আসামি কমান্ডার মোয়াজ্জাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মধুর ক্যান্টিনের মধু ও তার পরিবার এবং ইকবাল হলের ছাত্র ও কর্মচারীদের হত্যা করা হয়েছে। 

সকালে উঠে দেখা যায় সব বাড়ি নিস্তব্ধ। বাড়িভর্তি লোকজন তাদের কিছু না জানিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে গেছে। অবস্থা দেখে বেগম মুজিব বলেন, আর তো এখানে থাকা সম্ভব নয়। কাজেই এই বাড়ি ছেড়ে তারা রাজারবাগ হয়ে ওয়ারীর দিকে রওনা হন। পথে দেখা পেলেন ধ্বংসস্তূপ ও মৃত মানুষের লাশ। 

বলদা গার্ডেনের পাশে শ্বশুরবাড়িতে কাটে কিছুদিন। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের অবস্থানকে সহজভাবে নিতে পারছিল না দেখে বেগম মুজিব অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে একাই বের হন খোকা। মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকায় অনেক খালি বাসা আছে জেনে ফিরে গিয়ে বেগম মুজিবসহ অন্যদের নিয়ে রওনা হন তারা। চৌধুরীপাড়ায় বাসা দেখতে গেলে স্থানীয় কৌতূহলী মানুষ গাড়ি ঘিরে ধরে। অবস্থা দেখে গাড়ি ঘুরিয়ে খোকা বলেন, আজকে না হয় ওয়ারীতেই ফিরে যাই। বেগম মুজিব অসম্মতি জানিয়ে বলেন, দরকার হলে গাড়িতেই রাত কাটিয়ে দেব সবাই। বাধ্য হয়ে খোকা চৌধুরীপাড়ার ভেতরের দিকেই যেতে থাকেন। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে। কারফিউ শুরু হবে। এই সময় একটি দোতলা নির্জন প্রায় পরিত্যক্ত বাড়ি দেখে বাড়ির আঙিনায় গাড়ি ঢোকান। সবাইকে গাড়িতে রেখে খোকা একা বাড়িতে ঢোকেন। নিচতলা ফাঁকা, কেউ নেই। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ না থাকলেও খোকার মনে হয় দোতালা জনশূন্য নয়। সাহস করে দোতলার একটা রুমে ঢুকে অবাক হয়ে দেখেন কামরাতে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে পলি (সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে, জলির বড় বোন) এবং তার স্বামী ওদুদ সাহেব। খোকাকে দেখে পলি মামা বলে ছুটে আসে। সেই রাতে প্রায় বিনিদ্র ও অনাহারে রাত কাটে সবার। পরদিন সকালেই উঠে খোকা আবার বেরোয় বাড়ির খোঁজে। চৌধুরীপাড়াতেই সুন্দর দোতলা একটা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে জেনে দেখা করতে গিয়ে বিস্মিত হতে হয় খোকাকে। বাড়ির মালিক মহিলা এবং তার বিশেষ পরিচিত। কমলাপুরের জাহাজ বাড়ির মালিক এই মহিলার বাড়িতে ১৯৫৫ সালে খোকা এবং তার বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার গিয়াসউদ্দিন ভাড়া ছিলেন। স্নেহশীল এই মহিলা সব শুনে খুশি মনেই সম্মত হন। বেগম মুজিব এবং বাচ্চাদের নিয়ে এ বাড়িতে আসবার সময় পলিও সঙ্গি হয়, সে তখন অন্তঃসত্ত্বা।

কয়েকদিন না যেতেই বেগম মুজিব হাসিনার খোঁজ নিতে বললেন। খোকা তার শালাকে ড. ওয়াজেদের অফিসে পাঠিয়ে জানতে পারল তারা এই চৌধুরীপাড়াতেই এক বন্ধুর বাসায় আছে। খোকা তার বাসায় দেখা করতে গেলে ড. ওয়াজেদ তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তার আশঙ্কা খোকার পেছনে মিলিটারি গোয়েন্দা আছে। 

বিষণ্ন মন নিয়ে আসার সময় তার সঙ্গে আসে জলি (সৈয়দ হোসেন সাহেবের মেয়ে)। 

বেগম মুজিব যখন কামালের জন্য চিন্তিত তখন এক দুপুরে সে এলো খোকার সমন্ধী মুরাদ ভাইয়ের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে। কামাল থাকল না, দেখা করে সন্ধ্যার পরে চলে গেল। সম্ভবতঃ এর পরই শেখ কামাল ফরিদপুর থেকে সাতক্ষীরা হয়ে ভোমরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যায়। যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। 

কদিন পরে বেগম মুজিব খোকাকে বললেন, সৈয়দ হোসেন সাহেবের খোঁজ করতে। ২৫ মার্চের পর পলি-জলিদের সঙ্গে পিতা-মাতার দেখা হয়নি। সাইদ সাহেব তখন পরিবার নিয়ে সোবহানবাগ সরকারি কলোনিতে থাকতেন। 

সেখানে গিয়ে খোকা নতুন ঝামেলায় পড়েন। সৈয়দ সাহেবের স্ত্রী খোদেজা বেগম লিলি ধরে বসেন তাদের সদরঘাট পৌঁছে দিতে, তারা ঢাকায় থাকবেন না। লঞ্চে দেশে যাবেন, গাড়ি নিয়ে সদরঘাট যাাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, পথে পাকিস্তানিরা চেক করবে। এরপরও খোকাকে যেতে হয়। তবে তার ভাগ্য ভালো, নিরাপদে সদরঘাট পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসেন। 

এই সময়ে আকাশ বাণীর খবরে জানতে পারেন বৈদ্যনাথ তলায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ নেওয়ার সংবাদ। 

একদিন বিকালে শেখ শহীদ (এরশাদ সরকারের মন্ত্রী) এসেছিল সম্পর্কে ভাবী বেগম মুজিবের কাছে বিদায় নিতে, সে কিছুদিনের মধ্যে ভারত যাবে। শেখ শহীদ চলে যাওয়ার পর তার পরিচিত এক মহিলা এসে চেঁচামেচি শুরু করে। বাড়িওয়ালীকে রাগত স্বরে বলেন, আমাদের না জানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন, এখন পাকবাহিনী এসে সমস্ত পাড়া জ্বালিয়ে দেবে।

সব শুনে বেগম মুজিব আবার বাসা দেখার কথা বললে খোকা তার পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত সচিব মইনুল ইসলামের সঙ্গে জহুরুল ইসলামের অফিসে দেখা করেন। 

তিনি পরামর্শ দেন মগবাজারে জনাব নুরুদ্দিন ও বদরুন্নেসাদের খালি বাসায় ওঠার জন্য। তারা ভারতে চলে গেছেন। সেদিনই তারা সবাই মগবাজারের শূন্য বাসায় ওঠেন। সেদিনের ‘দৈনিক পাকিস্তান’ সংবাদপত্রের করাচি বিমানবন্দরে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হলেন যে শেখ সাহেব জীবিত আছেন। 

একদিন বাইরে থেকে ফিরে এলে বেগম মুজিব ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলেন, এখুনি এই বাড়ি ছাড়তে হবে। কিছু আগে দুজন মিলিশিয়া খোকারগাড়ি দেখে তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সে আবার আসবে বলেও জানিয়েছে। ব্যস তখনি তারা সে বাসা ছেড়ে গাড়িতে ওঠেন। 

মগবাজারের পেট্রলপাম্পের পাশের এক গলির ভেতর দিয়ে যেতে একটা দোতালা বাড়ির নিচতলা ভাড়া হবে জেনে বাড়ির মালিক মহিলার সঙ্গে দেখা করে তাকে সবিস্তারে জানান। তিনি খুশি মনে ভাড়া দিতে রাজি হন। এই বাসায় ওঠেন সবাই। 

এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা বোমা হামলা শুরু করেছে। একদিন ড. ওয়াজেদ শেখ হাসিনাকে নিয়ে উপস্থিত। তারা চৌধুরীপাড়ায় যেখানে থাকতেন সেখানে থাকা নিরাপদ মনে করছেন না। আসন্ন প্রসবা হাসিনাকে কাছে পেয়ে মা বেগম মুজিব স্বস্তি পেলেন। 

কয়েক দিন পর কামালের খবরের জন্য খোকা গেলেন মরহুম মানিক মিঞার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে ধানমন্ডির বাসায় থাকতেন। ওখানেই শুনলেন সেনাবাহিনীর লোকজন এ বাড়িতে আসে বেগম মুজিবের খোঁজে। তারা পরামর্শ দিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। আত্মসমর্পণ করলে  সেনাবাহিনী নিরাপত্তা দেবে। নয়তো তারা ঠিকই খুঁজে বের করবে তখন সাধারণ সৈনিকরা হয়তো তাদের বাসাই উড়িয়ে দেবে। 

মগবাজারের বাসায় ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার মাকে নিয়ে এসে উপস্থিত হন। মা আর ছেলে বেগম মুজিবকে আত্মসমর্পণ করে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় থাকার পক্ষে বিভিন্নভাবে বোঝান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথা না দিয়ে কয়েকদিন সময় নেন। শেখ হাসিনা মায়ের কাছে আসন্ন প্রসবা, তার শরীরও ভালো নয়। এর ভেতরে ঢাকা শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। খালেদ মোশাররফ এবং মেজর হায়দারের  গেরিলা বাহিনী ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে যখন তারা বিশ্বকে দেখাতে চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো গণ্ডগোল নেই। 

এর ভেতর একদিন জরুরি খবর এলো আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাসায় যাওয়ার। গিয়ে দেখেন জেনারেল ওমর বসে। সম্ভবতঃ তিনি তখন পাকিস্তানের আইএসআইয়ের প্রধান। যাওয়ার পরপরই জেনারেল সরাসরি মূল কথায় চলে আসেন। প্রথমে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাকিস্তানের কোনো বড় শহর বা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের উল্লেখ করেন। খোকা দুই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। তখন জেনারেল ওমর বলেন, আপনাদের পছন্দের কোনো বাড়ির কথা বলেন, সেখানেই আমরা ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু আমাদের প্রহরাধীনে থাকতে হবে। সেদিন, তখুনি বাড়ি দেখতে বেরোন তারা। অনেকগুলো বাড়ি দেখার পর ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (বাড়ি নম্বর ২৬। বর্তমানে রোড নম্বর ৯এ, বাড়ি নম্বর ২৬) একটা বাড়ি পছন্দ হলো। এক তলা বাড়ি, উঁচু সীমানা প্রাচীর। পেছনে বেশ জায়গা, সামনে সুন্দর গেট। 

জেনারেল ওমর বললেন, ‘কোই বাত নেহি, হাম লেলেতে ইয়ে মাকান। তুমি অভি যাকে তোমহারা ভাবিকে লেআও।’
‘পড়েছি যবনের হাতে, খানা  খেতে হবে সাথে’ সেই প্রবাদের মতো। সেদিনই উঠতে হলো ১৮ নম্বর সড়কের সেই বাড়িতে। ওঠার আগে ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে নিত্য ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র এবং মেঝেয় পড়ে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেক নিয়ে আসেন। জেনারেল ওমর সেই অ্যাকাউন্টের টাকা ওঠানোর চেকে এবং অথরিটি লেটারে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষর আনিয়ে দেন পাকিস্তান থেকে। বাসায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর চৌকি বসে গেল। সম্ভবতঃ সেদিন ছিল ১২ মে ১৯৭১।

এই ফাঁকে ২৫ মার্চের আগের সময়ে দেখে নেওয়া যায়
টুঙ্গিপাড়ার শেখ জহরুল হক ও  হোসেন আরা বেগমের মেয়ে বেগম ফজিলাতুন নেছা রেনুর তিন বছর বয়সে বিয়ে ঠিক হয় আপন চাচাতো ভাই শেখ মুজিবুর রহমান খোকার সঙ্গে। এর পাঁচ বছর পর ১৯৩৮ সালে রেনু ও খোকার বিয়ে হয়। তখন রেনুর বয়স ৮ এবং খোকার বয়স ১৮। খোকা অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান পড়তেন ক্লাস টেনে। ছোট বেলায় চোখে বেরিবেরি রোগ হওয়ায় তার তিন বছর সময় নষ্ট হয় এবং একটু বেশি বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পাঁচ বছর বয়সে পিতা-মাতা দুজনই মারা যাওয়ায় রেনু চাচা শেখ লুৎফুর রহমানের (খোকার পিতার) বাড়িতেই থাকতেন। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পাস করে শেখ মুজিবুর রহমান ওই সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় এসে ১৫০ মোগলটুলিতে ওঠেন। 

১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তার দুই বন্ধু খোন্দকার আব্দুল হামিদ ও জালাল মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে মেজো ফুপু আছিয়া বেগমের ছেলে মমিনুল হক খোকার ৮/৩ রজনী বোস লেনের বাসায় ওঠেন। এর কিছুদিন পর, আগে থেকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে শেখ মুজিবুর রহমান বেগম ফজিলাতুন নেছাকে নিয়ে আসেন রজনী বোস লেনের ছোট বাসায়। তখন শেখ হাসিনার বয়স ছয় বছর এবং শেখ কামালের বয়স চার। বাসায় উঠে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শেখ মুজিবুর রহমান। 

১৯৫৪ সালের ৭ থেকে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলের নির্বাচনি জোট যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের প্রভাবশালী ওয়াহিদুজ্জামানকে গোপালগঞ্জের আসনে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করেন। শেরেবাংলার নেতৃত্বে গঠিত প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় তাকে কৃষি ও বনমন্ত্রী করা হয়।

মন্ত্রী হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান রজনী বোস রোডের বাসা ছেড়ে মিন্টু রোডের সরকারি বাসায় ওঠেন। মমিনুল হক খোকা বাড়িতে গিয়েছিলেন, ভাঙ্গা থেকে এসে দেখেন শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার এবং সব জিনিসপত্র নিয়ে আগের বাসা ছেড়ে দিয়ে গেছেন। তাকে কিছুই জানানো হয়নি। খোকার বিছানাপত্র, দুটো ট্রাংকও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খোকা অসন্তুষ্ট হন। শেখ মুজিব খোকার পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘তোর আবার আলাদা বাসা কীসের? এখন থেকে তুই তো সবসময় এখানেই থাকবি।’

বেগম মুজিব বলেন, ‘ভাডি, তোমার ভাই কী বলেন মনে রেখ, আজ থেকে তোমার আলাদা কোনো ঠিকানা নেই’। ভাডি মানে ভাইডি, খোকাকে তার ভাবী আদর করে ভাডি বলেই ডাকতেন। শেখ মুজিব পাশে বসে পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘খোকা তোর ওপর আমি নির্ভর করতে পারি। আমার জীবনের তো কোনো নিশ্চিত ঠিকানা নেই। কখন কোথায় থাকতে হয় বলা যায় না। তোর ভাবী  আর পরিবারকে দেখাশোনার ভার আমি তোকেই দিলাম। তোকে আমার বড় কাছের মানুষ বলে মনে হয়। তুই আমার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সাথী।’ খোকার ওপর এই নির্ভরতা পরবর্তী দুঃসহ বছরগুলোতে তিনি যথাযথভাবে পালন করেছেন।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা স্থায়ী হয়নি। আদমজী জুটমিলে মুসলিম লীগ সরকারের বাঁধানো বাঙালি-বিহারি দাঙ্গার অভিযোগে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিন্টু রোডের বাসা সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতে হয়। সবাই ওঠেন নাজিরা বাজারে মেয়র হানিফদের বাসায়। সেখানে বেশি দিন থাকা হয়নি। ১৯৫৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় বাড়িতে পানি ওঠায় নাজিরা বাজারের বাসা থেকে গিয়ে তারা ওঠেন আরমানীটোলার ঢাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফেজ মোহাম্মদ মুসার বাড়িতে। সেখানেই শেখ রেহানার জন্ম হয়।

১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করলে শেখ মুজিবুর রহমান বাণিজ্য, শিল্প ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মন্ত্রী  হন এবং পরিবারের সদস্যরা আব্দুল গনি রোডের সরকারি বাসায় উঠে আসেন। এই সময়ে শেখ মুজিব পাকিস্তান টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেগুনবাগিচায় টি বোর্ডের বাসায় সবাইকে নিয়ে ওঠেন। ১৯৫৮ আইয়ুব খানের মার্শাল জারির পর ১২ অক্টোবর সেগুনবাগিচার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরদিনই বেগম মুজিব এই বাসা ছেড়ে শান্তিনগরের একটি নির্মীয়মাণ বাসায় ওঠেন। বাসাটি বসবাসের উপযোগী না হওয়ায় এই বাসা ছেড়ে ওঠেন সেগুনবাগিচার এক অবসরপ্রাপ্ত জজ সাহেবের বাসায়। এই সময়ে জেল থেকে পাঠানো শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৩২ নম্বরের বাড়ির কাজ শুরু করা হয়। এবং বাড়ির কাজ ভালোভাবে শেষ না হলেও বেগম মুজিব ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওঠেন ৩২ নম্বরের বাড়িতে [সঠিক নম্বর: পুরাতন বাড়ি নং-৬৭৭, রোড-৩২; নতুন বাড়ি নং-১০, রোড-১১]। ১৯৫৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাণিজ্য, শিল্প ও দুর্নীতি দমন বিভাগের মন্ত্রী। তখন বেগম মুজিবের অনুরোধে শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত  সচিব নূরুজ্জামান গণপূর্ত বিভাগে আবেদন করেন। ১৯৫৭ সালে ৬ হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই জমিতে বাড়ি  নির্মাণ করা হয় এবং এ কাজে ইসলাম গ্রুপের জহুরুল ইসলাম এবং সম্পর্কিত আত্মীয় ও সিঅ্যান্ডবির চিফ ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলামের আশ্বাস ও সহযোগিতা ছিল। এই সময়ে কামাল ও জামাল শাহীন স্কুলে এবং শেখ হাসিনা প্রথমে নারী শিক্ষা মন্দিরে এবং পরে কামরুন্নেছা গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। 

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সারা দেশে সাময়িক আইন জারি করা হয়। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ অভ্যুত্থানে সেই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৮ নম্বর রোডের বাসায় থাকা অবস্থায় কিছু ঘটনা ঘটে 
বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতা গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকায় এসে ওঠেন সদরঘাটের নৌকায়। বেগম মুজিবের নির্দেশে খোকা ছোটেন সোহানবাগে। বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন খোদেজা হোসেন লিলি সদরঘাট থেকে লঞ্চে চলে গিয়েছিলেন বাড়িতে, তারা ফিরে এসে সোবহানবাগ সরকারি কোয়ার্টারে উঠেছেন। খোকা গিয়ে সদরঘাট থেকে তাদের নিয়ে এসে লিলিদের বাসায় ওঠান। কিছুদিন পর ডা. নুরুল ইসলামের সহায়তায় পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন তারা।

শেখ হাসিনার প্রসবের সময় হয়ে এলে তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার সঙ্গে একজন আয়া থাকতে পারে জেনে স্বেচ্ছায় তার ছোট ফুপু খোদেজা হোসেন লিলি (এটিএম সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী) আয়া হিসেবে হাসিনার সঙ্গে থাকেন। ২৭ জুলাই রাত ৮টায় জন্ম নেয় সজীব ওয়াজেদ জয়। বেগম মুজিবের চোখের অসুবিধার জন্য শান্তিনগরে ডা. মতিনকে দেখানো হয়। ফেরার পথে বেগম মুজিব পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখে আসেন। এই চলাচলের সময় সার্বক্ষণিক সেনাবাহিনীর লোকজন সঙ্গে থাকত। আগস্ট মাসের প্রথম দিকে ঘটল বিস্ময়কর ঘটনা। এক সকালে উঠে জানা গেল জামাল বাসায় নেই। মানে সে উধাও হয়েছে। 

১৮ নম্বর বাড়ির সামনে ছিল একটি পান-সিগারেটের দোকান, জামাল মাঝে মাঝে সেখানে যেত। দোকানদার রহমান একসময় তাদের বাসার কাজের লোক ছিল। তার কাছ থেকে জানা যায় জামাল ভারতে গেছে। 

আসন্ন বিপদের সম্ভাবনায় সম্পর্কীয় মামু মইনুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত সচিব)-এর পরামর্শে দরখাস্ত দিয়ে বেগম মুজিব রাও ফরমান আলীর সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করেন। অনুমতি পাওয়া গেলে বেগম মুজিবকে নিয়ে খোকা বেরোবেন। এই সময় ড. ওয়াজেদ এসে জেদ ধরলেন খোকা নয় সঙ্গে যাবেন তিনি। বাধ্য হয়ে বেগম মুজিবের সঙ্গে যান ড. ওয়াজেদ। ফিরে এসে কী কথা হয়েছে তা না বলে অবিলম্বে খোকাকে পালিয়ে যেতে বললেন ড. ওয়াজেদ। তাকে নাকি শিগগিরই ক্যান্টেনমেন্টে ডাকা হবে। 

বেগম মুজিব খোকাকে ছাড়লেন না। দুই দিন পরে যে মেজর সাহেব এই পরিবারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি এসে খোকাকে নিয়ে রওনা হলেন ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে। প্রথমে মেজর সাহেব তার অফিস এবং পরে বাসায় নিয়ে যান। বাসা মানে একটা স্টেশন ওয়াগান। মেজর সাহেব কফি খাওয়ালেন। কিন্তু কোনো কথা বলছেন না। এর মধ্যে খোকার সঙ্গে মেজর সাহেবের অনেক কথা হয়েছে, অন্তরঙ্গতা হয়েছে। আজ যখন কোনো কথা বলছেন না তখন তার অর্থ তাকে নিয়ে আসা হয়েছে ইন্টারোগেশন সেলে অত্যাচারের জন্য এবং শেষে দেওয়া হবে মৃত্যুর আদেশ। নিশ্চুপ অনেকটা সময় পার হওয়ার পর একটা ফোন আসে। ফোন রেখে মেজর সাহেব চিৎকার করে ওঠেন, ‘খোকা সাব, তোম বাচ গ্যায়ে-বাচ গায়ে।’ খোকাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলেন, ‘জানো অর্ডার হয়েছিল তোমাকে বধ্যভূমিতে পাঠাতে হবে। তাই এতক্ষণ আমি নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম কী করে এ কাজ করি। এতদিন তোমাকে দেখছি, তোমার স্ত্রীকে দেখছি, তোমার ছেলেকে দেখছি- খোদা আমাকে বাঁচিয়েছেন আর তোমাকে দিয়েছেন প্রাণভিক্ষা।’

> বামে ১৮ নম্বরের সেই বাড়ি যেখান থেকে বেগম মুজিব ও অন্যদের মেজর তারা উদ্ধর করেন
> ডানে বেগম ও শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মেজর তারা, পেছনে ডান খেকে জামাল, কামাল ও মমিনুল হক খোকা

বামে ১৮ নম্বরের সেই বাড়ি যেখান থেকে বেগম মুজিব ও অন্যদের মেজর তারা উদ্ধার করেন ১৬ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান বাহিনীর সমর নায়ক লে. জেনারেল এ কে নিয়াজি ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। 

এর এক দিন পর ভারতীয় বাহিনী কুমিল্লার গঙ্গাসাগরের যুদ্ধে অসম সাহসের পরিচয় দিয়ে ‘বীরচক্র’ খেতাবপ্রাপ্ত মেজর অশোক কুমার তারা সিং একাকী এবং খালি হাতে গিয়ে ধানমন্ডি ১৮ নম্বরের রোডের বাড়ি (নম্বর ২৬, বর্তমান রোড নং-৯এ) থেকে ডজনখানেক সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জিম্মায় থাকা বেগম মুজিব এবং তার সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করেন। তার ফিরে আসেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। শেখ কামাল ও শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে সেনাবাহিনীর পোশাকে ফিরে আসেন ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে। পরিপূর্ণ হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি।

ঋণ স্বীকার: মমিনুল হক খোকার  ‘অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও আমি’ এবং নেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক

জাতীয় শিক্ষাক্রম ফ্রেমওয়ার্ক-২০২১ প্রণয়নে স্টেকহোল্ডারদের মতামত কতটা গুরুত্ব পেল?

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৪:২৭ পিএম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৫:০৫ পিএম
জাতীয় শিক্ষাক্রম ফ্রেমওয়ার্ক-২০২১ প্রণয়নে স্টেকহোল্ডারদের মতামত কতটা গুরুত্ব পেল?
মো. হাবিবুর রহমান

গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য একটি কার্যকরী শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) প্রণয়ন অপরিহার্য। কারিকুলাম প্রণয়নে স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন জাতীয় কারিকুলাম প্রণয়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে? বা কীভাবে করা হয়েছে? প্রণীত জাতীয় কারিকুলাম এখন বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে, এ বিষয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া কী বার্তা দেয়? 

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুবাদে স্নাতক পর্যায়ে দুটি ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি কারিকুলাম প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। টারসিয়ারি পর্যায়ে বর্তমানে ওবিই (OBE, Outcome Based Education) পদ্ধতিতে কারিকুলাম প্রণয়নের জন্য ইউজিসি কর্তৃক নির্দেশনা রয়েছে। এই পদ্ধতিতে কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্টেকহোল্ডারদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। মোটাদাগে এই স্টেইকহোল্ডাররা হলেন: বিষয় বিশেষজ্ঞ (Subject Experts); প্রাক্তন শিক্ষার্থী (Alumni); শিক্ষার্থীদের বা যাদের জন্য কারিকুলাম প্রণয়ন করা হচ্ছে তাদের প্রয়োজন  (Target Population's Needs); অভিভাবক  (Guardians); চাকরিদাতা (Employers); এডভাইজরি প্যানেল (বিভিন্ন পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত) এবং সমাজের সদস্য (Community Members)। আমি ও আমার সহকর্মীরা কারিকুলাম প্রণয়নের সময় উল্লিখিত এই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাদা করে বসেছি, আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছি এবং তাদের মতামতগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। প্রণীত কারিকুলামেও এর যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) প্রনয়নের  ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কমিটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রভাব/ফলাফল জাতির জীবনে সুদূরপ্রসারী। সুতরাং শিক্ষাক্রম প্রণয়নের প্রক্রিয়াও যথাযথ ও সময়োপযোগী হওয়া বাঞ্চনীয়। কারিকুলাম প্রণয়নের ধাপসমুহ সঠিকভাবে অনুসরণ করলেই যে, প্রণীত কারিকুলাম ত্রুটিমুক্ত হবে একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। কারিকুলামের কার্যকারিতা ভালো বোঝা যাবে এর বাস্তবায়ন পর্যায়ে। তবে, কারিকুলামের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। কেন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না? বা দুর্বলতাগুলো কোথায়? তা চিহ্নিত করা জরুরি। কেননা এর মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অভিভাবকদের সাথে কথা বলেছি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেছি। এই আলোকে অভিভাবকদের কাছ থেকে আমি অনেক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভালো নয়। অভিভাবকদের মাধ্যমে এই নেতিবাচক মনোভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে এবং তাদের মানসপটেও নতুন কারিকুলামের প্রতি তথা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে। যা আদতে নতুন প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত। সুতরাং শুরুতেই এই অনাস্থা দূর করা জরুরী। মোটাদাগে যে বিষয়গুলো অভিভাবকগণ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের সাথে আমার আলোচনায় উঠে এসেছে, সেগুলো হল: ক। নতুন কারিকুলাম প্রণীত সিলেবাস, বই-পুস্তক, শ্রেণী-শিখন পদ্ধতি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আস্থাহীনতা; খ। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট ও চূড়ান্ত না হওয়া (অতিমাত্রায় পরীক্ষামূলক বা এক্সপেরিমেন্টাল); গ। নতুন কারিকুলাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের (দেশে ও বিদেশে) উচ্চ শিক্ষা পদ্ধতির বা কারিকুলামের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এবং এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণার অভাব; ঘ। সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। 

নতুন কারিকুলামের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত, প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিক সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। কারিকুলাম প্রণয়নের প্রাইমারি স্টেইকহোল্ডারদের একদম বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না এবং কোনো ভালো ফলাফলও বয়ে নিয়ে আসবে না। কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং একে ফলপ্রসূ করতে হলে স্টেইকহোল্ডারদের যৌক্তিক মতামত গ্রহণ ও তাদের সহযোগিতা অনস্বীকার্য।  

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা
[email protected]

একেই বলে ছাগলধরা!

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৪ পিএম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৪, ০৫:০৪ পিএম
একেই বলে ছাগলধরা!
ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া (মুন্না)

আগের দিনে ছাগল নিয়ে যত প্রবাদ ছিল তা বর্তমান সময়ের একটি ছাগল পরিবর্তন করে দিয়েছে। ছাগলে কিনা খায়, পাগলে কিনা বলে? হাজার টাকার বাগান খাইল পাঁচ সিকার ছাগলে! এসব প্রবাদ এখন উল্টে গেছে। এখনকার ছাগলরা উচ্চবংশীয়! যা তা খায় না। তথাকথিত ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা ইমরান হোসেনের প্রচেষ্টায় এবার বিরল কিছু গরু ও ছাগল কোরবানির বাজারে এসেছে। আমাদের সৌভাগ্য হয়েছে এসব বিরল গরু ও ছাগলের বিষয়ে জানার ও দেখার। সরাসরি নয়, ফেসবুকের কল্যাণে।

একটি গরুর দাম ১ কোটি আর একটি ছাগলের দাম ১৫ লাখ। শুনতে গল্প মনে হলেও এটাই বাস্তব। এগুলো সাধারণ কোনো গরু ও ছাগল নয় বরং এরা উচ্চবংশীয়, এদের পূর্বপুরুষরা এলিট শ্রেণির। এদের বিশেষ কেরামতি আছে। সত্যিই তাই। এরা এমন ভাইরাল গরু ও ছাগল যে এদের লালন-পালনকারী, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই ইতোমধ্যে সুপার ভাইরাল হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত আমরা শুধু একটি ছাগলের কেরামতি দেখছি, কোটি টাকার গরুর কেরামতি দেখার অপেক্ষায় আছি।

বাংলাদেশের সর্বত্র এখন এই ভাইরাল ছাগল নিয়ে বেশ তুলকালাম চলছে। মজার বিষয় হলো ছাগলটি আমাদের সমাজের তথাকথিত ওপর শ্রেণির কিছু মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। যে কাজ কোনো দিন কেউ করতে পারত কি না সন্দেহ রয়েছে, তা একটি ছাগল অনায়েসে করে দেখিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, এই ছাগলের ভয়ে এখন সবাই তটস্থ। রীতিমতো কারও কারও ঘুম হারাম করে দিয়েছে এই ছাগল। ছাগলকাণ্ডে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে এর ক্রেতা ইফাত। আবার ছাগলকাণ্ডে ক্রেতা ইফাতকে অস্বীকার করেছে তার জন্মদাতা বাবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মো. মতিউর রহমান (সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত)। পর্দার আড়ালে চলে গেছে পুরো মতিউর পরিবার। কী নিদারুণ পরিস্থিতি? যে ছাগল কাঁঠাল পাতা খায়, সে এখন আমাদের মানুষ চেনাচ্ছে। এই ছাগলকাণ্ডে আমরা মতিউর রহমান নামক একজন অতি ক্ষমতাধর, বিশাল সম্পদশালী অসৎ সরকারি অফিসার সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তার ঠিকুজিকুষ্ঠি পুরোপুরি উদ্ধার হয়েছে। তার স্ত্রীরা, পুত্র ও কন্যারা কোথায় কী করছেন, কী কী অবৈধ সম্পদ ভোগদখল করছেন তা গোটা পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যে মতিউর রহমানকে ইতিপূর্বে কেউ থামাতে পারেনি একটি ছাগল তা করে দেখিয়েছে। এই ছাগলের কল্যাণেই জানতে পারলাম যে, এই মতিউর রহমান ছিলেন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সব ক্ষমতার ওপরে। বাংলাদেশের সব স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছিল মতিউর রহমানের শক্ত নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশের যে কাউকে তিনি ম্যানেজ করার স্বক্ষমতা রাখতেন। তার দাপটে ভালো ও সৎ অফিসাররা ছিলেন অসহায়। মনে হচ্ছে মতিউর রহমান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে খুব ছোট করে ফেলেছিলেন, যেখানে চাইলেই যা ইচ্ছে তা করা যায়। কীসের আইন, কীসের নিয়ম, কীসের শৃঙ্খলা। একটি দেশকে পিছিয়ে দিতে এরকম দু-একজন মতিউর রহমানই কি যথেষ্ট নয়? রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে মতিউর রহমানের মতো মানুষেরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেবে না, তা তো হতে পারে না। তাই তো একটি ছাগলের মাধ্যমে মতিউর রহমানকে বধ করা হয়েছে। এটা কি নিছক কাকতালীয়? নাকি দুর্ভ্যাগ্যবশত? নাকি অ্যাক্সিডেন্ট? সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা ধরা বড় দায়। 

উদ্বেগের বিষয় হলো, ছাগলটা কিন্তু এখনো আছে। ইমরান হোসেনের খামারে, গলার কাঁটা হয়ে! এই ছাগল দিয়ে সে কী করবে? বিক্রি করবে, কে কিনবে? ১৫ লাখ টাকার ছাগল নিজে জবাই করে খাবে, এই রকম ব্যবসায়ী তো সে নয়! তবে এই ছাগল নিয়ে সে যা করবে তাতেই কিন্তু নিউজ বের হবে। 

সাংবাদিকরা এই ছাগলের সংবাদ প্রকাশের জন্য রীতিমতো অপেক্ষা করছেন। তবে বাংলাদেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসব কোরবানিতে ১ কোটি টাকার একটি গরু আর ১৫ লাখ টাকার একটি ছাগল বিক্রি করে যে ব্রেক-থ্রো ঘটিয়েছে উদ্যোক্তা ইমরান হোসেন, তার বিড়ম্বনা তো তাকে পেতেই হবে। কোরবানি তো আর লোক দেখানোর বিষয় নয়। উচ্চবংশীয় গরু/ছাগল, এদের পূর্বপুরুষরা এলিট শ্রেণির সাধারণ মানুষের কাছে এসব বিষয়ের কি আদৌ কোনো গুরুত্ব আছে? ইমরান হোসেন বিভিন্ন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে যতই সাফাই গাক না কেন সাধারণ মানুষ বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। তবে একটি কাজের জন্য ইমরান হোসেনকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় যে, তার অতিদামি এসব গরু ও ছাগল অবৈধ টাকার মালিকদের ধরতে একটা টোপ হিসেবে কাজ করেছে। যে টোপে ধরাশায়ী হয়েছেন মতিউর রহমানের মতো অতি কৌশলী ও প্রতাপশালী অসৎ অফিসার। কে জানে এরকম উচ্চবংশীয় গরু/ছাগল আবার কোনো এক নতুন মতিউরকে ধরার জন্য বসে আছে কিনা?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরি করে বড় চেয়ারে বসার সুযোগে চতুরতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যারা অবৈধ টাকার পাহাড় বানিয়েছেন, হাজার হাজার কোটি টাকা চুষেছেন বা চুষে যাচ্ছেন, তারা দয়া করে থামুন। সাবধান হোন। আপনাদের অবৈধ টাকা দিয়ে আপনারা সর্বোচ্চ কী করতে পারেন তা দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেন, বিদেশে বাড়ি কেনেন, দেশে অভিজাত এলাকায় নামে-বেনামে ফ্ল্যাট/বাড়ি ক্রয় করেন, কয়েক শ বিঘা জায়গার ওপর রিসোর্ট নির্মাণ করেন আর ছেলেমেয়েদেরে এসব অবৈধ টাকা অবাধে খরচ করতে দেন, এই তো? তাই সরকারি চাকুরে, যাদের কাছে এরকম হাজার হাজার কোটি টাকা রয়েছে তাদের জন্য একটা পরামর্শ- টাকাগুলো বিদেশে প্রাচার না করে বরং তা দিয়ে বঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করুন, দেশের টাকা দেশেই রাখুন, বাংলাদেশের হাজার হাজার বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুন, অনুন্নত গ্রামের উন্নয়নে ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ান। ভালো কাজে ব্যবহার করেন। তা না হলে আপনিও একদিন নিশ্চিত এরকম ছাগলবধ হবেন। যাদের সহযোগিতায় অপকর্ম করেছেন, স্বার্থ বিনিময় করেছেন তারা কেউ কিন্তু আপনার দায় নেবে না। আপনাকে ছিছি করবে গোটা জাতি। আপনার অর্থই হবে অনর্থের মূল। এরকমই এক ছাগলকাণ্ডে উন্মোচিত হবে আপনার সব কুকর্ম, তাসের ঘরের মতো ধ্বংস হবে আপনার অবৈধ টাকার পাহাড়।

লেখক: অধ্যাপক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

প্রশ্নফাঁস: মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:৪১ পিএম
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:৪১ পিএম
প্রশ্নফাঁস: মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
তৌহিদ-উল বারী

পড়াশোনা মানে যেন লাভ-ক্ষতির ব্যবসা। এমনটাই পরিলক্ষিত হয়, যখন ক’টা টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন মিলে যায়। তাহলে তো আর কথা নেই। ব্যাস! এখন শুধু খাতায় গিয়ে লিখে দেওয়াটা বাকি। কি বা দরকার এত লেখাপড়া করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। যেখানে টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন পাওয়া যায় আর পরে মিলে যায় লোভনীয় সার্টিফিকেট। এভাবেই যেন গেঁথে দেওয়া হয়েছে বর্তমান শিক্ষার্থী আর অভিভাবকের মাথায়। একটি স্বল্প শিক্ষিত মানুষ নামের কুচক্রী মহল তাদের এই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ের মধ্য দিয়েই পড়াশোনাকে বানিয়ে ফেলেছে একটি লাভ-ক্ষতির ব্যবসা।

প্রশ্নফাঁস একটি সভ্য জাতির জন্য কলঙ্ক বয়ে আনে নিঃসন্দেহে। যা আমরা শুনে এসেছি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ‘If you want to destroy a nation, first destroy it’s education’ যদি তুমি একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাও তাহলে প্রথমেই ওই জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস কর।

এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, এ যেন শত্রুপক্ষ বাঙালি জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার এক মহোৎসবে মেতে ওঠেছে। একটি স্বল্পশিক্ষিত মহল যেন শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করছে।

এসব স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মাথায় বিন্দুমাত্র কাজ করে না, প্রশ্ন ফাঁসের কারণে জাতির কত বড় সর্বনাশ হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হচ্ছে না বরং এরা তার থেকে বিমুখ হচ্ছে। যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা কোনোরকমে টেনেটুনে পাসের চিন্তা রাখে তাদের দলেই ধাবিত হচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। কারণ একটাই, এসব শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে পাশ করার চেষ্টা। যার প্রেক্ষিতে মেধাবীরা আজ পড়াশোনার প্রতি, মেধাচর্চার প্রতি বিমুখ হচ্ছে। 

কেমন জানি, প্রশ্নফাঁস করে অবৈধ টাকা কামানোর নেশায় নেমেছে সংঘবদ্ধ একাধিক চক্র। ফলে গত ছয় বছরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এসব চক্রের প্রায় তিন শতাধিক সদস্য। এর মধ্যে রয়েছে ডাক্তার, শিক্ষক, ছাত্র, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের পরিচালকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। কেউ কেউ একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে ফের একই অপরাধ করছে। বিচার কার্যক্রমের ধীরগতির সুবিধাও নিচ্ছে এসব চক্রের সদস্যরা।

তবে এত এত গ্রেপ্তারের পরও কেমন জানি এই প্রশ্নফাঁস ঠেকানোই যায় না। কোনো না কোনো ভাবে এসব প্রশ্ন ফাঁস হয়েই যায়। কেন বারবার এমনটা হচ্ছে? এর পিছনে কারা দায়ী? কিসের ঘাটতি রয়েছে এই কুচক্রী মহলকে ঠেকানোর পেছনে? নাকি এভাবেই চলতে থাকবে ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো। প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে, পরীক্ষা দেবে, অপরাধীও শনাক্ত হবে। কিন্তু বিচারের কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকবে না। তাহলে এরকম হলে কেমন হবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবন? এটা নিয়ে কি আমরা মোটেও ভাবার বিষয় মনে করছি না! 

তবে আমরা এটা নিশ্চিত ভাবে জানি প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর ৪ নম্বর ধারায় এই শাস্তির বিধান আছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ আসামিদের অপরাধের শাস্তির রায় হয়নি। তাহলে কি এটাই হতে পারে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তির কারণ? নাকি আরও কোনো অদৃশ্য কারণ রয়েছে এ প্রশ্নফাঁসের পেছনে। খতিয়ে দেখা হোক, চিরতরে বন্ধ হোক প্রশ্নফাঁসের এই দুর্নীতি-অনিয়ম। দিনশেষে মেধাবীরাই তাদের মেধার মেধার স্বাক্ষর রাখুক।

লেখক: শিক্ষার্থী ও কলামিস্ট 
[email protected]

মহুয়া পালায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমাজচিত্র: সেকাল ও একাল

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৪, ০৪:৫৫ পিএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৪, ০৪:৫৭ পিএম
মহুয়া পালায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমাজচিত্র: সেকাল ও একাল
মো. রেজাউল করিম

‘মহুয়া’ পালা মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম আলোচিত গীতিকাব্য। সাহিত্য সর্বদাই সমাজের ব্যক্তি-মানুষ ও সমাজের উপরিস্থিত ও অন্তস্থ আন্তসম্পর্কের বর্ণনাচিত্র। মৈমনসিংহ গীতিকায় কবিরা সরল লোকজ ভাষায় মানবজীবনের গান গেয়েছেন। চরিত্র-চিত্রণের নৈপুণ্যে নর-নারীর প্রেম অনুভূতির স্তর অতিক্রম করে স্পষ্ট বাস্তবতায় কাহিনিসমূহ অমরত্ব লাভ করেছে। মহুয়া পালা এমনই এক আখ্যানচিত্র যে পালা বা গাথায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমাজচিত্র বিধৃত হলেও তা গোটা বাংলার, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমাজচিত্র হিসেবেই গণ্য করা যায়। মহুয়া পালায় বর্ণীত আখ্যানের সমাজচিত্র পৌনে চার শ বছর পরও চলমান বঙ্গীয় সমাজে অনেকাংশেই বিদ্যমান বলে প্রতীয়মান হয়।

মৈমনসিংহ গীতিকার প্রায় সব কাব্যই মানব-মানবীর প্রেমাখ্যানের মনোস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মহুয়া পালাও তার ব্যতিক্রম নয়। এই পালার প্রধান দুই চরিত্র- নদের ছাঁদ ও মহুয়া সামাজিক অবস্থানের দুই মেরুতে অবস্থানকারী দুই যুবক-যুবতী। শুধু যে সামাজিক অবস্থান পৃথক তা-ই নয়, তাদের ধর্মও পৃথক। অথচ তারা একে অপরের প্রতি প্রেমাসক্ত হয়। প্রেম, পরিবার ও সমাজসৃষ্ট ঘাত-প্রতিঘাত, মানোস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, প্রেমের প্রতি অকুণ্ঠ প্রতিশ্রুতি ও ত্যাগ- ফলে পরিবার ও সমাজসৃষ্ট আরোপিত নিগ্রহ এবং আরোপতি নিগ্রহের বিরুদ্ধে মনোস্তাত্ত্বিক দ্বৈরথের আখ্যান এই পালার উপজীব্য। পরিশেষে যার সমাপ্তি ঘটে ট্র্যাজিক পরিণতির মধ্য দিয়ে। 

নদের চাঁদ ও মহুয়া পালার চিত্রায়ন শুরু হয় গারো পাহাড়ের ওপারে হিমানী পর্বতে, যা কিনা ছয় মাসের দূরত্ব।  হিমানী পর্বতের ওপারে ঘন জঙ্গল যেখানে চন্দ্র কিংবা সূর্যের আলো পৌঁছে না- এমন ঘন জঙ্গলে বাস করে ডাকাত সর্দার হুমরা, তার বাহ্যিক পেশা সাপুড়ে তথা বেদে- ডাকাত সর্দার হুমরা ‘হুমরা বাইদ্যা’ নামেই পরিচিত। ষোলো বছর আগের ঘটনা- হুমরা বাইদ্যা কাঞ্চনপুর গ্রামের এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে ডাকাতি শেষে অপরূপ রূপ-মাধুর্যের অধিকারী ছয় মাসের এক কন্যাকে দেখে চুরি করে নিয়ে আসে। এই ঘটনা শুধু যে তৎকালীন সমাজচিত্র তা-ই নয়, পৌনে চার শ বছর পরও বর্তমান বেদে জনগোষ্ঠী কর্তৃক শিশু, বিশেষত শিশুকন্যা চুরির কথা শোনা যায়। 

চুরি করে আনা শিশুকন্য মহুয়া অন্তজ বেদে সমাজে বেড়ে উঠতে থাকে আরও দশটি মেয়ের মতো। সাপের খেলা, নাটকীয় সংলাপ, নদী থেকে জল আনা, এমনকি ঘোড়ায় চড়া- সব কাজেই সে পারদর্শী হয়ে ওঠে। ভাগ্য অন্বেষণে নদী, জলাশয়, পাহাড় অথবা গ্রামীণ লোকালয়ে মৌসুমভেদে ঘুরে বেড়ায় তারই পালক-পিতা বেদেসমাজের দলপতির সঙ্গে। যাযাবর শ্রেণির বেদেসমাজ দলপতির ‘বৈদেশেতে’ যেত- সেই পর্বের বর্ণনা পাওয়া যায় পালায় এভাবে: ‘ঘোড়া লইল গাধা লইল, কত কইবো আর- সঙ্গেতে করিয়া লইল রাও চণ্ডালের হাড়- শিকারি কুকুর লইল শিয়াল হেজে ধরে- মনের সুখেতে চলে বৈদেশ নগরে।’ উপরিউক্ত স্তবক থেকে জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেদে সমাজের পরিভ্রমণের চিত্র জানা যায়, যা এখনো বিরাজমান। তবে বর্ণনায় আতিশয়োক্তি রয়েছে বলে মনে হয়। একই নৌকায় কুকুর আর শেয়াল বহনের ঘটনা বর্ণনার আতিশয়োক্তি বলেই প্রতীয়মান হয়।

এই স্তবকে সনাতন বাঙালি সমাজের আতিথেয়তার প্রমাণও পুরিস্ফুট। জমিদারের নায়েব প্রথম দর্শনেই মহুয়ার প্রেমে পড়ে। মহুয়াও তার প্রতি সমভাবে আকৃষ্ট হয়। সে নিজেদের আলয়ে নদেরকে নিমন্ত্রণ জানায়, যা পালায় এভাবে বর্ণীত হয়েছে: ‘আমার বাড়িত যাইওরে বন্ধু বইতে দিয়াম পিরা- জল পান করিতে দিয়াম সালি ধানের চিরা- সালি ধানের চিরা দিয়াম আরও সবরি কলা- ঘরে আছে মইষের দইরে বন্ধু খাইবা তিনো বেলা।’ পালার এই স্তবক এ দেশের সনাতন সমাজের লোকজ খাদ্য দিয়ে হাজার বছরের আতিথেয়তা প্রকাশ করে, যা আজও গ্রামীণ সমাজে বিদ্যমান।

তৎকালীন বেদে সমাজের নারীরা তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিষ অথবা ধারালো অস্ত্র সঙ্গে রাখত। পালার বিভিন্ন পর্বে তার বিবরণ পাওয়ায়। এ ছাড়া বিষের বিশেষ ব্যবহার লক্ষ্যণীয়, যা বেদে সমাজে সে-সময়ে ছিল, এখনো আছে এমন তথ্য প্রমাণিত। এই পালায় তক্ষকের বিষ অস্ত্র হিসেবে বিবৃত হয়েছে যখন মহুয়া তাকে অপহরণকারী সওদাগরের মাঝি-মাল্লাদের বানিয়ে দেওয়া পানের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেয়। এখানে দুটি দৃশ্যকল্প অবলোকন করা যায়। প্রথমত, বেদেকন্যা নিজের কাছে গোপনে বিষ রাখত। দ্বিতীয়ত, তারা সেই যুগে, এমনকি বর্তমানেও কথার জাদুতে মানুষকে মোহাবিষ্ট করতে পারে। তাই তো দেখা যায়- যারা তাকে অপহরণ করেছে, তার নাটকীয় কথার মাধুর্যে মোহাবিষ্ট হয়ে তারই সাজিয়ে দেওয়া পান খেয়ে সবাই অচেতন হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, বেদে সমাজে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া মাত্রই বিশেষত নারীরা পান খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা এখনো বিদ্যমান। 

গোটা পালা নিবিড় অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, এই পালার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজচিত্র, যা পৌনে চার শ বছর পর আজও শুধু বেদে সমাজ নয়, বাংলার গ্রামীণ সমাজে বিদ্যমান। রক্ষণশীল সমাজের বেদেকন্যা মহুয়া সুন্দরী ও জমিদারের দেওয়ান সুদর্শন পুরুষ নদের চাঁদের ভালোবাসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিন্ন ধর্ম এবং বিবাহ তথা সম্প্রদানের ব্যাপারে অভিভাবকের সিদ্ধান্তের প্রাধান্য। সে-যুগেও অভিভাবকের সিদ্ধান্তের বাইরে যুবক-যুবতী প্রণয়াসক্ত হতো, যা এই পালায় বিবৃত হয়েছে। তবে কোনো বাধাই দুজনের মধ্যে আত্মিক দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দুজনে আত্মাহুতির মাধ্যমে প্রমাণ করেছে ভালোবাসা শাশ্বত। এমন চিত্র বাংলার গ্রামীণ সমাজই শুধু নয়, শহুরে সমাজেও এখন কদাচিৎ হলেও জানা যায়।  

হুমরা বাইদ্যা নদের চাঁদের প্রতি তার আদরের পালিত কন্যা মহুয়ার আসক্তি টের পেয়ে যায়। এই পর্যায়ে দেখা যায়, হুমরা বাইদ্যা ভাবে- কিছুদিনের মধ্যেই দেশের বাড়ির জমিতে ফসল উঠবে; ফসল তোলার টান, বাড়ির পুকুরের মাছ ধরার মৌসুম, অন্যদিকে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে মহুয়ার গোপন প্রণয়ের আশঙ্কা- তাকে কিছু একটা করতেই হবে। বেদে দলে মহুয়ার সখা পালঙ্ক হুমরা বাইদ্যার নিষ্ঠুরতার আশঙ্কায় মহুয়াকে পরামর্শ দেয় এক সপ্তাহ বাইরে বের না হওয়ার জন্য। ঠাকুরবাড়িতে সে পৌঁছে দেবে মহুয়ার মৃত্যুর খবর। মহুয়া রাজি হয় না, উল্টো ঠাকুরবাড়ির পানে চেয়ে চন্দ্র-সূর্য আর পালঙ্ক সখাকে সাক্ষী মেনে নদের চাঁদকে স্বামী বলে ঘোষণা করে। পালঙ্ককে বলে সে নদের চাঁদকে নিয়ে পালিয়ে যাবে, অন্যথায় বিষপানে আত্মহত্যা করবে। হুমরা বেদে মহুয়ার অজান্তে দলবল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করে দলের অন্যদের সঙ্গে। হুমরা বাইদ্যা নদের চাঁদকে তক্ষকের বিষ প্রয়োগে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মহুয়ার হাতে বিষলক্ষার ছুরি দিয়ে নদের চাঁদকে হত্যা করতে বললে মহুয়া নদের চাঁদকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। পালায় যা বলা হয়েছে: ‘আরে করে ঝিলিমিলি নদীর কূলে দিয়া, দুজনে চলিল ভালা ঘোড়া সুয়ার হইয়া’। 

ধর্মীয় বিশ্বাস, বাদ-মতবাদ গীতিকা-রচয়িতাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আচ্ছন্ন করেনি। জীবনবিরোধী সবকিছুই অস্বীকৃত হয়েছে এ কাব্যমালায়। মৈমনসিংহ গীতিকায় মূলত মুক্ত প্রেমের জয়গান বিবৃত হয়েছে। এ গীতিকার নারীরা ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করেছে কখনো বা অভিভাবকের অভিমতের বিরুদ্ধেও জীবনসাথী বেছে নেওয়ার লক্ষ্যে ঝুঁকি নিয়েছে, গৃহত্যাগ করেছে। এটা কোনোকালেই অলৌকিক, অসম্ভব বা অবাস্তব ছিল না। যে কারণে বলা যায়, মৈমনসিংহ গীতিকায় নারীর শক্তি, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক মূল্যবোধের জয়গান বিবৃত হয়েছে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
[email protected]

পুলিশে সৃষ্ট অস্থিরতা

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৪, ০৩:১৫ পিএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৪, ০৩:১৫ পিএম
পুলিশে সৃষ্ট অস্থিরতা
মো. সাখাওয়াত হোসেন

সম্প্রতি ফিলিস্তিন দূতাবাসের সামনে এক পুলিশ সদস্য কর্তৃক অন্য এক পুলিশ সদস্য হত্যার ঘটনায় বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশে সৃষ্ট অস্থিরতা ও সংকট নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। গণমাধ্যম না যতটুকু তার থেকে কয়েক কাঠি এগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে কনস্টেবল কর্তৃক কনস্টেবল হত্যায় অনেকেই সন্তুষ্টির ঢেঁকুড় তুলেছে। এই যে পুলিশকে নিজের করে না ভাবা, পুলিশের দুঃসময়ে পাশে না থাকা, পুলিশকে মানসিকভাবে সমর্থন না করা ইত্যাদি বিষয়ে এক ধরনের হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশের মধ্যকার যেকোনো ধরনের নেতিবাচক সংবাদে আমাদের উৎফুল্ল হওয়ার একটি ব্যতিক্রমী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়গুলো পুলিশ সদস্যদেরও অজানা নয়। অথচ যখনই কোনো সংকটের মুখোমুখি হই কিংবা কোনোভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত বা আমাদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে কেউ ক্রোক করে এবং অপরাধীদের দ্বারা কোনোরকম ভয়ভীতি প্রাপ্ত হলে আমরা তৎক্ষণাৎ পুলিশের দ্বারস্থ হই। তদুপরি পুলিশকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচার ও সৃষ্টকরণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। 

খবরে জানা যায়; রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে সহকর্মীকে গুলি করে হত্যা মামলার আসামি পুলিশ কনস্টেবল কাওসার আহমেদের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায়। কাওসারের স্ত্রী নিলুফারের ভাষ্যে; কাওসারের দুই সন্তান আছে। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। সংসারে কোনো ঝামেলা বা কলহ ছিল না। তবে তিনি জানান, ‘কাওসারের মানসিক সমস্যা ছিল। রাঙামাটির বরকলে চাকরি করার সময় তিনি মানসিক সমস্যায় ভোগেন। এরপর বিভিন্ন সময় সরকারিভাবেই তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে অন্তত তিনবার চিকিৎসা করানো হয়েছিল। নিয়মিত ওষুধও সেবন করতেন। কাওসারের কাছে প্রেসক্রিপশনও আছে। সংসারে কোনো অভাব-অনটন ছিল না। তবে চাকরি নিয়ে খুবই টেনশন করেন তিনি। ছয় ঘণ্টার ডিউটি আট ঘণ্টা হতো।’

ইংল্যান্ডে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৩০ জন মানসিক সমস্যায় ভোগেন- গবেষণা জরিপে এমন তথ্যের আভাস পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষ যেহেতু তাদের সদস্যদের মানসিক সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেছে কিংবা উদ্যোগ নিয়েছে তাহলে সমস্যা-পরবর্তী সমাধানের আভাসও পাওয়া গেছে। ইংল্যান্ডের মতো দেশে; যে দেশে পুলিশ পাবলিকের একটি চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান, সেই দেশে পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশের মানসিক সমস্যার উদাহরণ একটি বড় প্রশ্নের সামনে নিয়ে আসে আমাদের। বাংলাদেশ পুলিশ কি আদৌ তাদের সদস্যদের মানসিক অবস্থানকে তুলে ধরার কিংবা যাচাই করার কোনোরূপ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে? অন্যান্য দেশে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রত্যেক ইউনিটে আলাদা করে সেন্টার স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসার বিষয়ে সেন্ট্রালি পুলিশ হাসপাতাল রয়েছে, যেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল এবং ইউনিট কিংবা রেঞ্জভিত্তিক চিকিৎসা সেন্টার কিংবা ডাক্তারদের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা করার তেমন ব্যবস্থা নেই। 

বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের চাকরিতে নানা রকমের চাপকে মোকাবিলা করেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলমান চাপকে মোকাবিলা করেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তথাপি এ ধরনের পেশাগত চাপকে ব্যবহারিকভাবে প্রশমনের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। সঙ্গত কারণেই পেশাগত প্রতিকূলতার আকার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসবের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অঘোষিত নেতিবাচকতাকে সব সময় পুলিশ সদস্যদের মোকাবিলা করতে হয়। বাংলাদেশে পুলিশ সদস্যদের পেশাগত চাপকে মোকাবিলা করতে বিশেষ ধরনের সাপোর্ট সেন্টার নেই। সাধারণত পুলিশ সদস্যরা যে ধরনের চাপকে মোকাবিলা করে থাকেন তার মধ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  

প্রথমত, পুলিশের চাকরিতে সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। সবসময়ই পুলিশকে সজাগ থাকতে হয়, কখন কোন নির্দেশনা চলে আসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে; এ ধরনের একটা তাড়না সবসময়ই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থাকে। আমরা সবাই জানি, জরুরি যেকোনো পরিস্থিতিতে পুলিশের সব ধরনের ছুটিও বাতিল হয়ে যায়। পুলিশের মূল কাজই হচ্ছে জনসাধারণের নিরাপত্তা দেওয়া এবং জনগণের সম্পদের সুরক্ষা দেওয়া। জায়গা থেকে পুলিশে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সারা দেশে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এবং হলফ করে বলা যায়, এ ইউনিটের সদস্যদের অধিকাংশ ঈদের ছুটি থেকে দায়িত্বের কারণে বঞ্চিত হন। 

দ্বিতীয়ত, সিনিয়র, জুনিয়র ও ব্যাচমেটদের সঙ্গে নানা বিষয়ে সম্পর্কের ঘাটতি একজন পুলিশ সদস্যের মানসিক বৈকল্যের কারণ হয়ে থাকে। বিসিএস অফিসারদের মধ্যে এমন দেখা যায়, কোনো এক ব্যাচের কর্মকর্তা ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন আবার ওই একই ব্যাচের কর্মকর্তা এখনো এসপি হতে পারেননি। এমন নজির ও উদাহরণ বাংলাদেশ পুলিশে রয়েছে। এ ব্যাপারগুলো একজন অফিসারকে মানসিকভাবে ট্রমার মধ্যে ফেলে রাখে, ফলে পুলিশিংসহ অন্যান্য কাজে তার একটি নমুনা পাওয়া যায়। পুলিশের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে একই ব্যাচের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ ও মতদ্বৈততার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, জুনিয়র বিভিন্ন উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে বিশেষ করে ছুটি ও কর্মঘণ্টা ইত্যাদি বিষয়ে। উপরন্তু আলোচনার জায়গা থেকে ব্যাচভিত্তিক ও রেঞ্জভিত্তিক সুযোগ-সুবিধার রকমফেরের কারণে মানসিক ট্রমার মধ্যে থাকেন অনেকেই। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পুলিশের পারফরম্যান্স ও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবান্বিত করে থাকে। 

তৃতীয়ত, একঘেয়েমি কাজ। নিয়মিত একই কাজে অনেক পুলিশ সদস্যের মধ্যে বিরক্তিবোধ চলে আসে। সে কারণেই কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য নিয়ে আসার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এমনও দেখা যায়, কেউ সরাসরি পেট্রোল নিয়ে ব্যস্ত আবার অনেক পুলিশ সদস্য অফিস ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে থাকেন। আবার কেউ কেউ আছেন একই রেঞ্জ কিংবা একই ইউনিটে দীর্ঘদিন কাজ করায় তার কাজের মান ও কাজের ধরনে উন্নতি না হয়ে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে আসছে। এ বিষয়গুলোকে সমন্বয়ে করে পোস্টি ও পদায়ন করা জরুরি, তা না হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের কাজের মানে তেমন তারতম্য দেখা যাবে না। 

চতুর্থত, পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক ধারণার ব্যাপারটি পুলিশের মনে ও মগজে গেঁথে আছে এবং এ ব্যাপারগুলো পুলিশ কর্তৃক ইতিবাচক ও প্রো-অ্যাকটিভ কাজের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের হাজার ভালো কাজ থাকলেও নেতিবাচক কাজটিকে সবার সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুলিশ একটি মানসিক অশান্তি নিয়ে দিনাতিপাত করে। বিপদে-আপদে পুলিশের সাহায্যের দ্বারস্থ হই এবং পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাই কিন্তু মূল্যায়নের সময় পুলিশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার লক্ষ্য নিয়েই যেন আমরা মতামত দিয়ে থাকি। এ ব্যাপারগুলো পুলিশ সদস্যদের গোচরীভূত এবং দায়িত্ব পালনের সময় উল্লিখিত বিষয়গুলো তাদের ট্রমার মধ্যে রাখে, যা পারফরমেন্সে প্রভাব ফেলে।  

পঞ্চমত, পদোন্নতি, বদলি ও পদকপ্রাপ্তিতে বৈষম্য ইত্যাদি কারণে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করে। পদোন্নতি নিয়ে সংস্থাটির বাইরে সরাসরি কোনো সদস্য কথা না বললেও তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও অভিমান বিরাজ করে। কমিউনিটিতে পরিচয় ও প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করে দেয় পদোন্নতি সংক্রান্ত ইস্যুগুলো, সে কারণেই পুলিশ সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করে থাকে। এ ব্যাপারগুলো সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের পারিবারিক ও কর্মময় জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। 

ষষ্ঠত, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কারণে স্বাধীনতা হরণ করা হয়, এ ধারণা রয়েছে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের। এ দোদুল্যমান অবস্থা থেকে পুলিশের অনেকেই বের হয়ে আসতে চান। পুলিশকে সংস্কারের ব্যাপারে প্রায় সবাই মতামত দেন। তথাপি কেন, কীসের জন্য পুলিশের সংস্কার আটকে গেছে, সেটি খুঁজে বের করে দ্রুততর সময়ে পুলিশকে স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করার সুযোগ দিলে পুলিশের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক হবে নিশ্চিতভাবেই। আমরা মনে করি ও বিশ্বাস রাখি, পুলিশকে যদি আমরা যথাযথভাবে ধারণ করতে পারি তাহলে পুলিশের কাছ থেকে আরও ইতিবাচক ও প্রো-অ্যাকটিভ কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করতে পারি। যেমনটি দেখেছিলাম করোনার সময়ে। সর্বোপরি পুলিশের সংকটগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতা অচিরেই সমাধান হয়ে আসবে।
    
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]