তরুণরা সব সময় নতুনত্বের প্রতীক। বিগত ১৬ বছরে কোনো রাজনৈতিক দল ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো আন্দোলন করতে পারেনি। সেটা তরুণ ছাত্ররা করে দেখিয়েছেন। ছাত্ররা সব সময়ই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এর জন্য আমি সব সময় পেছনের দিকে তাকাই। মানুষ পেছনে তাকিয়ে সবসময় নিজের জীবনটাকে বুঝতে পারে। আমিও পেছনে তাকিয়ে আমার জীবনটাকে বুঝছি, সব ঘটনাকে অবলোকন করছি, আমার অভিজ্ঞতাকে বোঝার চেষ্টা করছি। আমার অভিজ্ঞতা তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে- ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এই তিন রাষ্ট্র ভৌগলিক গঠনে, পতাকায়, নামে ভিন্ন। দুটি রাষ্ট্রই ভেঙেছে, আর বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর ভেতরে উন্নয়নের যে ধারাটা ছিল, তা কখনো বদলায়নি। সেই ধারা হলো পুঁজিবাদী ধারা। এটাই চরম বাস্তবতা।
রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দল দরকার। রাজনীতির দুটি ধারা আছে। একটি বুর্জোয়া ধারা এবং আরেকটি সমাজতান্ত্রিক ধারা। সমাজতান্ত্রিক ধারা হলো গণতন্ত্রের ধারা বা জনগণের ধারা। বুর্জোয়া ধারার মধ্যে রয়েছে সব রাজনৈতিক দল, যেমন- আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল। বুর্জোয়া ধারার রাজনীতি হলো মুনাফা লাভ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের রাজনীতি। বুর্জোয়া ধারার রাজনীতি বহুদিন ধরে আমাদের দেশে চলে আসছে। এই ধারার বিকল্প যে ধারা তা হলো গণতান্ত্রিক ধারা, যে ধারার সামাজিক কোনো মালিকানা নেই। গণতান্ত্রিক ধারা কখনোই সামাজিক মালিকানায় যেতে চায় না। রাষ্ট্রে সেই গণতান্ত্রিক ধারা বিকশিত করতে পারি কি না আমরা তা দেখছি। এই ধারা বিকশিত হওয়ার প্রয়োজনীতা বারবার আমাদের দেশ অনুভব করেছে। ১৯৪৬ সালে গণতান্ত্রিক ধারা আনয়নে বিপ্লব ঘটেছিল। সেই বিপ্লবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা বুর্জোয়ারা নিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে ১৯৪৭ সালে একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো। তার পর বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা অর্থাৎ অবাঙালিরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। তার পর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমরা সংগ্রাম করলাম। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের দেশকে বাঙালির হাতে নিয়ে নিলাম। তখন আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারতাম। কিন্তু তখনো বুর্জোয়ারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিলেন। আগে ছিলেন অবাঙালি বুর্জোয়ারা, আর এখন ক্ষমতায় আসছেন বাঙালি বুর্জোয়ারা। শেষ পর্যন্ত এই বুর্জোয়ারা ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট হিসেবে কাজ করেছে, যা নানাভাবে প্রকাশ হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্র পুরোটাই ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়েছে। জনগণের অধিকারকে বঞ্চিত করে বুর্জোয়ারা পুরোপুরি ক্ষমতায় এলেন ১৯৯১ সালে। এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় এলেন। ১৯৯১ সালে যখন তথাকথিত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হলো, তখন রাষ্ট্র পুরোপুরি বুর্জোয়াদের হাতে চলে গেল। তখন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল? এর মূল কারণ হলো তরুণ ছাত্ররা বিদ্রোহ করবেন। বড় বিদ্রোহগুলো ছাত্ররাই করেছেন। ছাত্ররাই ১৯৬৯-এ গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ছাত্ররাই এরশাদের পতন ঘটিয়েছেন। তাই এই বুর্জোয়ারা কখনো ছাত্র সংসদ চান না। কিন্তু তাদের একটা অংশ চান তাদের পেটুয়াবাহিনী হিসেবে ছাত্রদের ব্যবহার করতে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার তাদের ছাত্র সংগঠনের লোকদের আধিপত্য দিয়ে দেয়। সেই সংগঠনের ছাত্ররা লুটপাট করেন এবং সরকারের পক্ষে মিছিল করেন। তারা সরকারের তোষামোদি করেন এবং সরকারবিরোধীদের দমন-পীড়ন করেন। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
বুর্জোয়ারা ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। এটা বিএনপির আমলেও ছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি এবং সাইবার সিকিউরিটির নামে মামলা দিয়ে বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করেছে। সংবাদপত্রের মতপ্রকাশের যে স্বাধীনতা তা ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়েছে। আমরা আইয়ুব খান ও এরশাদের আমলে যতটা কথা বলতে পারতাম, এমনকি জিয়াউর রহমানের আমলে যতটা কথা বলতে পারতাম, বিগত ১৬ বছরে সেভাবে কথা বলতে পারিনি। দেশে একটা ভীতিকর ও সংশয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। মানুষকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়েছে, গুম ও হত্যা করেছে। আয়নাঘরের কথা আমরা আগে কখনো শুনিনি। বিগত সরকার চরম ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছিল। এই ফ্যাসিবাদী রূপটা হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের বুর্জোয়া শাসন। বুর্জোয়ারা বেআইনিভাবে আমলা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণির মানুষকে এভাবে নির্যাতন করেছেন।
একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন এবং শাসকদের জন্য ২০২৪ সালের বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, মানুষকে দমন-পীড়ন ও অপমান করে কখনো ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না, বরং পতনকেই সামনে নিয়ে আসা হয়। দেশে এখন সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটা অবশ্যম্ভাবী। মানুষের ভেতরে ভয় ভেঙে গেছে এবং ঐক্যের শক্তি উপলব্ধিতে এসেছে। এ কারণেই তরুণরা ফ্যাসিস্টদের গুলিতে একজন মারা গেলেও আরও শত শত তরুণ সামনে এগিয়ে গেছেন। অন্যায়, অবিচার ও জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল যাই হোক না কেন, আন্দোলনের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করা সম্ভব।
বুর্জোয়ারা দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচার করেছেন। বুর্জোয়ারা দমন-পীড়নের মাধ্যমে শাসন করেন, কিন্তু উৎপাদনে যান না। শ্রমজীবী মানুষ উৎপাদন করেন, অথচ বুর্জোয়ারা তাদের শাসন করেন। কৃষকরা উৎপাদন করেন, শ্রমিকরা কারখানায় উৎপাদন করেন, এভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উৎপাদিত সম্পদ বুর্জোয়ারা বিদেশে পাচার করে দেন। এমনকি বিদেশ থেকে শ্রমিকরা যে রেমিট্যান্স পাঠান তাও তারা বিদেশে পাচার করে দেন। বুর্জোয়ারা দেশে এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করে যাচ্ছেন, এতে দেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হচ্ছেন এবং তারা এর কোনো সমাধান করতে পারছেন না। ফলে দেশের অর্থনীতি দিন দিন আরও দুর্বল হচ্ছে। আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি। উন্নয়নের নামে এত টাকা ঋণ নিয়ে তা লুটপাট ও পাচার করা হয়েছে। সব ঋণের টাকা দেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে।
দেশে কতটা সংস্কার হবে তা নির্ভর করবে জনগণের ইচ্ছার ওপর। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের পরামর্শ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার। সে জন্য আমরা জনগণকে জাগিয়ে তুলতে পারি। মৌলিক পরিবর্তন এই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়; তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচন দরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তরের যে অঙ্গীকার করেছে, তার বাস্তবায়ন অবশ্যই করতে হবে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। যেমন- এবারের অভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসা ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই ফ্যাসিস্ট সরকার এবং এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে, সেই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পুলিশবাহিনী ও র্যাবের হাতে যে অপরিমেয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। দেশের সম্পদ পাচার, লুণ্ঠন ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতে হবে। পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারা পরিহার করে উন্নয়নকে সামাজিক মালিকানায় পরিণত করতে হবে।
আমরা দেশে যে সংস্কার চাইছি তা হলো- রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন; সংস্কার নয়। এই পরিবর্তনের জন্য দরকার একটি সামাজিক বিপ্লবের। এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের। বাংলাদেশের জনগণ বন্দি থাকতে চায় না, মুক্তি চায়- এটাই প্রত্যাশা।