দাসুন শানাকার বলে নাসুম আহমেদ গালিতে বল খেলেই এক রান নিয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের সুপার ফোরে সুপার জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরব আমিরাতের আজমানে বসবাসরত মোক্তার হোসেন তার পরিচিত একজনকে ফোন করেন, যিনি মাঠে খেলা দেখতে গিয়েছেন। বাংলাদেশের পরবর্তী দুটি খেলা দেখার জন্য তিনি টিকিট কনফার্ম করছেন। সবাই একসঙ্গে যাবেন খেলা দেখতে। অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলতে দুলতে বাংলাদেশের সুপার ফোরে খেলা নিশ্চিত হওয়ার পর দলটিকে নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে ওঠেন প্রবাসীরা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের পর সেই আশার তরীতে নতুন করে ঢেউ লেগেছে। যে ঢেউয়ে সবাই স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশ নোঙর করবে ফাইনালের মঞ্চে।
শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পর ফাইনালে যাওয়ার সেই রাস্তার দিকনির্দেশনা পেয়েছে। নেভিগেশন নিয়ে যাচ্ছে সেই পথে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে অবস্থা এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা কতটা দূর করা সম্ভব, তা বোঝা যাবে আজ ভারতের বিপক্ষে দ্বৈরথের পর। জিতলে রাস্তা পরিষ্কার, হারলেও সমস্যা নেই। পরের দিন পাকিস্তানের বিপক্ষে হবে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ। তবে ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে পাকিস্তান টিকে থাকবে কি না, তা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যাবে আজ (মঙ্গলবার) রাতের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে। জিতলে পাকিস্তান টিকে থাকবে বাংলাদেশের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। হেরে গেলে তাদের সম্ভাবনা নিভু নিভু করে জ্বলবে।
বিশ্ব ক্রিকেটে ভারত এখন মহাশক্তিধর এক দল। প্রতিপক্ষ যেকোনো দলই হোক না কেন, তাদের বিপক্ষে পেরে ওঠে না। এবারের এশিয়া কাপেও তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্রুপপর্বে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান তাদের সঙ্গে কোনো লড়াই-ই করতে পারেনি। সুপার ফোরেও পাকিস্তানকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। বাংলাদেশও তাদের কাছে শক্ত প্রতিপক্ষ নয়। পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে- অবস্থা চোখ কপালে ওঠার মতো। ১৬ বারের মোকাবিলাতে বাংলাদেশের জয় মাত্র একটিতে। যে ম্যাচ তারা জিতেছিল ২০১৯ সালে দিল্লিতে ৭ উইকেটে। যে ১৫টি ম্যাচে হেরেছে তার মাঝে ১০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নিশ্চিত জয়ী ম্যাচ হাতছাড়া করে হেরেছিল ১ রানে। ৩ বলে বাংলাদেশের ২ রানের প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ একটি রানও নিতে পারেনি। উইকেট হারিয়েছিল ৩টি। এর বাইরে আর কোনো ম্যাচেই বাংলাদেশ ন্যূনতম লড়াই করতে পারেনি। এবার কি পারবে? প্রধান কোচ ফিল সিমন্স জানিয়েছেন ভারতকে হারানো সম্ভব। তারা অজেয় নয়।
মাঠের লড়াইয়ে বাংলাদেশ পেরে না উঠলেও ভারতের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলো নিয়ে কিন্তু মাঠের বাইরে বেশ উত্তেজনা ছড়ায়। এই উত্তেজনা ২০১৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে শুরু হয়েছে। ইদানীং সেখানে যোগ হয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক বৈরিতা। যে বৈরিতার কারণে ভারত তাদের পূর্বনির্ধারিত বাংলাদেশ সফরে আসেনি। বাংলাদেশের মানুষের মাঝেও ভারতবিদ্বেষী মনোভাব খুব বেশি বেড়ে গেছে। যে কারণে আজকের ম্যাচে বাংলাদেশ যাতে জয়ী হয় সেই চাওয়া থাকবে সবার মনে-প্রাণে। যদিও সব ম্যাচেই বাংলাদেশের জয় প্রত্যাশা থাকে দেশবাসীর। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে জয়টা মর্যাদারও হয়ে উঠেছে।
এবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গেলেও শুরুটা করেছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্রমেই নিজেদের ফিরে পেতে শুরু করে। ফাইনালে খেলার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। প্রথম ম্যাচে হংকংয়ের মতো দলের বিপক্ষে ৭ উইকেটে জয়ী হলেও জয়ের ধরন দেখে প্রশ্ন উঠেছিল। তারপর তো শ্রীলঙ্কার কাছে বাজেভাবে হেরে সুপার ফোরে যাওয়ার রাস্তাই কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছিল। এর পরই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ায়। আফগানিস্তানকে হারিয়ে সুপার ফোরে যেতে নিজেদের কাজটি করে রেখে। শ্রীলঙ্কা এসে সেখানে মসলা দিয়ে তরকারি পাক করে আফগানিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে সুপার ফোরে সঙ্গী হয়। সেই শ্রীলঙ্কাকে আবার সুপার ফোরে হারিয়ে সুপার শুরু করে লিটন দাসরা কোটি কোটি বাংলাদেশীর অন্তরে ফাইনালের বীজ বপন করে দিয়েছেন। যেখানে এখন পরিচর্যা চলছে, ফল ধরার অপেক্ষায়।
আসরের শুরুতে বাংলাদেশ দলকে বিবর্ণ দেখা যাওয়ার কারণ ছিল ব্যাটারদের রান না পাওয়া। অন্যরা কম-বেশি রান পেলেও তাওহীদ হৃদয় ছিলেন পেছনের সারিতে। তিনি রান করলেও টি-টোয়েন্টি ধাঁচে রান করতে পারেননি। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনি ৩৭ বলে ৫৮ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে সব সমালোচনাকে বাক্সবন্দি করে ফেলেন। তাওহীদ হৃদয়ের রানে ফেরাটা ছিল দলের জন্য ইতিবাচক। পারভেজ ইমনের পরিবর্তে দলের ইনিংসের সূচনা করে সাইফ হাসানও খেলছেন দারুণ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনিও খেলেন ৪৫ বলে ৬১ রানের ইনিংস, যা তাকে এনে দিয়েছে ম্যাচসেরার পুরস্কার। আরেক ওপেনার তানজিদ তামিম, জাকের আলী আর শামীম পাটোয়ারীও প্রয়োজনের সময় রানের দেখা পাচ্ছেন। বোলিংয়ে মোস্তাফিজ রয়েছেন দারুণ ফর্মে। তাসকিনও ভালো করছেন। তৃতীয় পেসার হিসেবে শরিফুল আর তানজিম সাকিব যে কেউ খেলতে পারেন। স্পিন আক্রমণে নাসুম যোগ হওয়ার পর শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। রিশাদ ও মাহেদী আছেন সঙ্গে। তবে আজ দুই স্পিনার খেলাবে, না দুই পেসার খেলাবে- সেটা উইকেট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এসবের মাঝে ভারতের বিপক্ষে আজকের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভাবনার নাম অধিনায়ক লিটন দাস। দারুণভাবে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও তিনি আছেন রানের মাঝে। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচকে সামনে রেখে সোমবার অনুশীলনের সময় তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। এরপর আর অনুশীলনই করেননি। টানা দুই দিন ম্যাচ থাকায় গতকাল ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দল আর অনুশীলন করেনি। যে কারণে লিটনের বিষয়টিও জানা যায়নি। ইনজুরিতে পড়ার পর দলের সঙ্গে থাকা ডা. দেবাশীষ চৌধুরী জানিয়েছিলেন লিটনের আঘাত গুরুতর নয়। তবে তিনি আজকের ম্যাচ খেলতে পারবেন কি না, সে ব্যাপারে তখন কিছু জানাননি। তবে টিম ম্যানেজমেন্ট সূত্রে জানা গেছে, লিটনের ব্যাপারে তারা পজিটিভ। ম্যাচের দিন পর্যন্ত তারা লিটনের জন্য অপেক্ষা করবেন। তবে কোনো কারণে লিটন দাস খেলতে না পারলে সেটি হবে বাংলাদেশ দলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শুধু তার ব্যাটিং নয়, দলের নেতৃত্বও। কারণ বিসিবি এই আসরের জন্য লিটনের ডেপুটি হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করেনি।
পলাশ/নিলয়/