দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হওয়ার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। তবে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার শফিকুল ইসলাম রানা কমলা চাষের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই যুবক কৃষি উদ্যোক্তা নিজের জীবনধারা বদলেছেন। পাশাপাশি তার উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের জন্যও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। খবর বাসসের।
শফিকুল ইসলাম রানা পাঁচ বছর আগে মহাদেবপুর উপজেলার ঈশ্বর লক্ষ্মীপুর গ্রামে ১০ কাঠা জমিতে কমলা চাষ শুরু করেন। যদিও দেশে সাধারণত সবুজ রঙের কমলা চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু রানার বাগানে যে কমলা চাষ করা হয় তা প্রকৃত কমলা রঙের। এর ফলে তার বাগানের কমলা দেখতে যেমন চমৎকার, তেমনি স্বাদও অনেকটা ভিন্ন ও মিষ্টি। স্থানীয় বাজারে এই কমলার প্রচুর চাহিদা তৈরি রয়েছে এবং ক্রেতাসাধারণ সরাসরি বাগান থেকে কমলা সংগ্রহ করছেন।
রানার কমলা চাষের সফলতার গল্পটি শুরু হয় পাঁচ বছর আগে, যখন তিনি চুয়াডাঙ্গা থেকে কমলার চারা সংগ্রহ করে নিজের জমিতে রোপণ করেন। তার জমির জন্য প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল, যাতে চারার দাম, জমি তৈরির খরচ এবং পরিচর্যার খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথম বছর গাছগুলোতে তেমন কোনো ফলন আসেনি। তবে পরবর্তী সময় গাছগুলোতে প্রচুর ফল আসতে শুরু করে। রানার সাফল্যের মূল কারণ ছিল তার প্রতিদিনের নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিকভাবে কৃষি জ্ঞান ব্যবহার করা।
গত বছর, গাছগুলোতে প্রথমবার ফলন দেখা গেলেও, এবার তা অনেক বেশি পরিমাণে হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাছে মুকুল আসার পর, ওই ফলাফল আসার পর থেকেই বাগান থেকে কমলা তোলা শুরু হয়েছে। বর্তমানে তার ৪৫টি গাছ থেকে গড়ে প্রতি গাছে ২০ কেজি কমলা পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে প্রায় ৯০০ কেজি কমলা পাওয়া যাবে, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
রানার বড় ভাই আশরাফুল ইসলাম জানান, কমলা চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। শুধু সামান্য জৈব সার ও সেচ দেওয়া হয়, যা খরচের দিক থেকে খুবই সস্তা। তবে গাছের প্রতিদিনের পরিচর্যা এবং সময়মতো সেচ দেওয়াই মূল সাফল্যের কারণ।
রানার কমলার গুণগত মান এবং স্বাদ নিয়ে প্রতিবেশী কৃষক ইউনুস ও ফরহাদ জানান, রানার বাগানের কমলাগুলো অত্যন্ত মিষ্টি এবং সুস্বাদু। বিদেশ থেকে যে কমলাগুলো আমদানি হয়, রানার বাগানের কমলাগুলো সেগুলো থেকে স্বাদে কোনো অংশে কম নয়। তারা নিয়মিত রানার বাগানে এসে কমলার স্বাদ গ্রহণ করেন। ওই অভিজ্ঞতা তারা অন্যদেরও শেয়ার করেন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মহাদেবপুরের মাটি বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত। এটি কমলা চাষের জন্য উপযুক্ত। এই অঞ্চলে কমলা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। তেমন কোনো খরচ নেই। একবার গাছ লাগালে অনেক বছর ফলন পাওয়া যায়।’ তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ কমলা চাষে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে, রানার কমলা বাগান থেকে স্থানীয় কৃষকদের অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। তারা নিজ নিজ জমিতে কমলা চাষে উদ্যোগী হচ্ছেন। এটি এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। রানার অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে কাজ করছে। যাতে কমলা চাষের মাধ্যমে তারা জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, কমলা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে আরও অনেক উদ্যোক্তা চিন্তা করছেন এবং রানার মতো যুবকরা তাকে অনুসরণ করতে পারেন। কৃষি সেক্টরের প্রতি অধিক মনোযোগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা হলে, দেশের কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।