মানবসভ্যতার কাঠামো টিকে আছে সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর। কিন্তু এই সম্পর্কের গভীরে রয়েছে এক নীরব বৈষম্য, সংসারে নারীর শ্রমকে ঘিরে গড়ে ওঠা অদৃশ্য রাজনীতি। এই শ্রম দৃশ্যমান নয়। অথচ সেটিই সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের টিকে থাকার মূলে রয়েছে।
প্রতিদিন অসংখ্য নারী তাদের জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সন্তান ও বয়োবৃদ্ধের যত্ন, মানসিক সেবা এবং পারিবারিক স্থিতি রক্ষার কাজে। অথচ এই বিশাল পরিসরের শ্রম সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ হিসেবে বিবেচিত হয়, কখনো ‘কাজ’ হিসেবে নয়। এই অস্বীকৃত বাস্তবতা নারীর জীবন, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক পরিচয়ের ওপর গভীর ছায়া ফেলে।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, অবৈতনিক শ্রম হলো এমন সব কাজ যা পরিবারের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য, কিন্তু যার জন্য কেউ পারিশ্রমিক পায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের ‘টাইম ইউজ সার্ভ’ দেখায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে প্রায় সাত গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন গৃহস্থালি ও যত্নমূলক কাজে। অথচ এই শ্রমের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় না, হয় না রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্তি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী নারীরা দৈনিক গড়ে চার ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট অবৈতনিক শ্রম দেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে সময় মাত্র এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট। এই ব্যবধান শুধু সময়ের নয়, ক্ষমতা ও স্বীকৃতিরও।
নারীবাদী চিন্তাবিদ সিলভিয়া ফেডেরিচি তার প্রবন্ধ Wages Against Housework-এ দেখিয়েছেন, গৃহস্থালির কাজকে ‘ভালোবাসা’ ও ‘দায়িত্ব’ হিসেবে রোমান্টিসাইজ করা আসলে পিতৃতন্ত্রের সাংস্কৃতিক কৌশল। এ কৌশল নারীকে এক অনন্ত সেবার বৃত্তে আবদ্ধ রাখে, যেখানে শ্রমের বিনিময়ে ভালোবাসা প্রত্যাশিত হয়, কিন্তু শ্রমের স্বীকৃতি অনুপস্থিত থাকে। পুরুষ ও রাষ্ট্র উভয়েই এই অদৃশ্য শ্রমের সুবিধাভোগী। পিতৃতন্ত্র নারীকে বলে, ‘এটাই তোমার কর্তব্য’, আর পুঁজিবাদ সেই কর্তব্যের অদৃশ্য ঘামে টিকে থাকে। ফলে গৃহস্থালির শ্রম অদৃশ্য রেখে সমাজ নারীকে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল করে তোলে, যেন তার আত্মপরিচয় চিরকাল অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
অক্সফামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে নারীর অবৈতনিক শ্রমের বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের মোট আয়ের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, নারীর গৃহস্থালির ও যত্নমূলক অবৈতনিক শ্রমের অর্থমূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশের সমান, যার ৮৫ শতাংশের বেশি অবদান নারী। অথচ এই বিশাল অবদান রাষ্ট্রের বাজেট বা অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো অগ্রাধিকার পায় না। অর্থনীতির পর্দার আড়ালে নারী আসলে এক অদৃশ্য স্তম্ভ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে দৃশ্যমান সমাজব্যবস্থা।
অবৈতনিক শ্রমের প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানসিকও। নারী যখন সারা দিনের কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বসেন, সমাজ বলে ‘সে তো ঘরে থাকে।’ এই ‘ঘরে থাকা’র ধারণা তার শ্রমকে শূন্যে নামিয়ে আনে, তাকে আত্মমূল্যহীনতায় ঠেলে দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ইমোশনাল ইনভিজিবিলিটি; যেখানে নারীর অনুভূতি, যত্ন ও অবদান সবই অদৃশ্য করে দেওয়া হয়। এ অদৃশ্যতাই নারীর মানসিক নিঃসঙ্গতা ও পরিচয়ের সংকটের মূল।
সমাধানের শুরু হতে পারে স্বীকৃতি দিয়ে। রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে অবৈতনিক শ্রমের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যেভাবে কিছু দেশ ইতোমধ্যেই ‘care economy’ ধারণাকে নীতিনির্ধারণে যুক্ত করেছে। পরিবার পর্যায়ে কাজের সমবণ্টনও অপরিহার্য; পুরুষের অংশগ্রহণ কেবল সাহায্য নয়, দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। পাশাপাশি শিক্ষা ও গণমাধ্যমে নারী শ্রমের মর্যাদা ও সময়ের মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সংসারে নারীর অবৈতনিক অবদান আসলে সমাজের টিকে থাকার অদৃশ্য ইঞ্জিন। এই শ্রমের বিনিময়ে নারী কেবল পরিবার নয়, রাষ্ট্রকেও টিকিয়ে রাখেন। তবু তার কাজকে এখনো ভালোবাসার ‘দায়িত্ব’ বলে আড়াল করা হয়। নারীবাদ এই আড়াল ভাঙারই সংগ্রাম, যেখানে ভালোবাসা আর শোষণের সীমারেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, যত্ন যদি একতরফা হয়, তবে তা ভালোবাসা নয়, বরং ক্ষমতার অন্য এক নাম। সমাজ যতদিন এই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করতে না পারবে, ততদিন নারী হয়ে থাকবেন সভ্যতার সবচেয়ে দৃঢ় অথচ অস্বীকৃত স্থপতি।
/এস লুপিন