৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নারী উন্নয়নচিত্র নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষা, অর্থনীতি, ডিজিটাল দক্ষতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীদের দৃশ্যমান উন্নয়ন লক্ষ করা গেলেও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বাস্তব বাধা নারীর অগ্রযাত্রাকে এখনো আটকে রেখেছে।
শিক্ষা: প্রবেশ হার বৃদ্ধি, কিন্তুপূর্ণ সমতা প্রশ্নবিদ্ধ
শিক্ষা হলো নারী ক্ষমতায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সরকারি তথ্যানুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০.৪৩ শতাংশ নারী এবং তাদের সাক্ষরতার হার ৬২.৯২ শতাংশ (৭+ বয়সে)। ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্যে দেখা যায়, নারী-পুরুষের শিক্ষাগত ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং শিখন হার প্রায় সমতার দিকে এগোচ্ছে।
তবে গুণগত শিক্ষায় নারীর প্রবেশ সমান নয়। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি এখনো তুলনামূলকভাবে কম, যা প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো– পোশাক খাতের নারীদের মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ে বা মাতৃত্বের কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা। বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোরের এক তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেন, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনে।
কর্মসংস্থান: অংশগ্রহণ বাড়লেও নিরাপত্তা ও সুযোগ সীমিত
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে শ্রমবাজারে বড় ধাক্কা আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার ১৮ লাখই নারী।
ফরমাল সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ আরও উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, দেশে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ নারী নিয়মিত চুক্তিভিত্তিক কর্মে নিয়োজিত এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ নারী শ্রমিক নিজেদের শ্রম অধিকার বা আইনি সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।
স্থানীয় পর্যায়ের বৈষম্যও স্পষ্ট। কিশোরগঞ্জের শ্রমবাজার গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ নারী কোনো কর্মসংস্থানে যুক্ত নন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি ঘাটতির প্রতিফলন। বিশ্বব্যাংক বলছে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে দেশের জিডিপি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে—অর্থাৎ নারী শ্রমশক্তি উন্নয়নের সরাসরি অর্থনৈতিক তাৎপর্য আছে।
ডিজিটাল দক্ষতা ও উদ্যোক্তা: প্রশিক্ষণ আছে, কিন্তু প্রতিফলন সীমিত
ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ বিস্তৃত হয়েছে। আইসিটি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে ৩৫ হাজার ৬০০ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৪০০ নারী, যা ইতিবাচক। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার যেমন–সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি বা ডেটা সায়েন্সে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো অপ্রতুল। ‘শক্তিকন্যা ২০২৫’-এর মতো উদ্যোগে তরুণ নারীরা সবুজ শক্তি বা পরিবেশ প্রযুক্তিতে যুক্ত হলেও সংখ্যায় তা মোট জনশক্তির খুব ক্ষুদ্র অংশ। ফলে ডিজিটাল খাতের আসল নেতৃত্ব বা উদ্যোক্তা–পরিসরে নারীর উপস্থিতি এখনো সীমিত।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক নিরাপত্তা: অগ্রগতি আছে, বাধাও দৃশ্যমান
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের রিপোর্টে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা পিছিয়েছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ–উপাদানে। যদিও স্থানীয় সরকার ও সংসদে নারীর উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে, কিন্তু কাঠামোগত বৈষম্য এখনো মূল অন্তরায়।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ অনুসারে, দেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তত একবার ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হন; যা নারীর সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণকে দুর্বল করে। অনলাইন হয়রানিও বেড়েছে; প্রযুক্তিনির্ভর যুগে এটি নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
নারীর শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নেতৃত্বে শক্তিশালী অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও বৈষম্যমূলক কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, প্রযুক্তি-বঞ্চনা ও সামাজিক বাধা নারীর অগ্রযাত্রাকে সীমিত রাখে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে স্পষ্ট হচ্ছে–নারীর উন্নয়ন শুধু নারীর নিজের উন্নয়ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। উন্নয়ন কাঠামোতে নারীর পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই সম্ভব টেকসই ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
/এসএল