১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লার বিষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ স্কুলটি দেশভাগ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ ঐতিহাসিক সকল ঘটনা পরিক্রমার সাক্ষী হয়ে আছে। অথচ এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা ভাষা শহিদ কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানকারী শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আজো পায়নি কোনো শহিদ মিনার। স্কুলটি থেকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার অনেক দূরে হওয়ায় তাদের সেখানেও যাওয়া হয় না। ফলে পার্শ্ববর্তী কালিয়াজুড়ি এলাকার শহিদ মিনারে গিয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় তারা। আর স্কুলের শিক্ষকরা ফুল নিয়ে আসেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। ওই স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছে- দ্রুত এখানে শহিদ মিনারে নির্মাণের।
শুধু বিষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নয়; খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শহিদ মিনার নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় বিপাকে। এরমধ্যে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বাঁশ-কাঠ-ইট বা ককসিট দিয়ে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে সেখানে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কিছুই হয় না। এতে করে শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশাত্মবোধ এবং ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসের গুরুত্ব ও শহিদদের আত্মদান সম্পর্কেও জানতে পারছে না তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা জেলায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং মাদ্রাসা রয়েছে ৩ হাজার ২২৫টি। এরমধ্যে ১ হাজার ৫৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই শহিদ মিনার।
জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে, বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২ হাজার ১০৭টি। এরমধ্যে ১ হাজার ২৩৮টি বিদ্যালয়েই শহিদ মিনার নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৭৪টি; শহিদ মিনার নেই ৭২টি বিদ্যালয়ে। স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা ৫০টি; শহিদ মিনার নেই তিনটিতে, কলেজের সংখ্যা ১১৭টি; শহিদ মিনার নেই ১৪টিতে। এ ছাড়া পুরো জেলাজুড়ে মাদ্রাসা রয়েছে ৩৭৭টি। এরমধ্যে শহিদ মিনার নেই ২৫৯টিতে।
বিষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সৈয়দা লায়লা নূর বলেন, আমাদের এখানে শহিদ মিনার না থাকায় বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমাদের শিক্ষার্থীরা স্কুল প্রাঙ্গণে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারছে না। বিষয়টি বেশ কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমাদের স্কুলে শহিদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী কালিয়াজুড়ি এলাকার শহিদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। আর আমরা শিক্ষকরা কুমিল্লা কেন্দ্রীয় শাহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যাই। আমরা চাই আমাদের স্কুলে একটি শহিদ মিনার স্থাপন করা হোক।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম বলেন, সকল বিদ্যালয়ে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বা শহিদ দিবসের তাৎপর্য বুঝতে পারত। আমরা আশাবাদী সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নির্মাণ হবে।
কুমিল্লা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে- মূলত উদ্যোগের অভাবে এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নির্মাণ হয়নি। আমরা প্রধান শিক্ষকদের উৎসাহিত করছি। আশা করছি সব বিদ্যালয়েই শহিদ মিনার হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয় নিজস্ব উদ্যোগে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার মাধ্যমে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নেই; সেখানে শহিদ মিনার স্থাপনের জন্য ব্যবস্থা নেবে। আমরা সবসময়ই মাতৃভাষা এবং ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রজন্মকে ছড়িয়ে দিতে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার স্থাপন জরুরি বলে মনে করি।