প্রশাসনের শর্ত না মেনেই শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীতে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলতে থাকলে নড়িয়া-জাজিরা ডান তীররক্ষা বাঁধসহ বিস্তীর্ণ জনপদ আবারও ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। যদিও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দাবি, প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই বৈধভাবে কাজ করছে তারা। তবে জেলা প্রশাসন শর্ত ভঙ্গের প্রাথমিক প্রামাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে নড়িয়া উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়। নদীগর্ভে বিলীন হয় অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই ভাঙন রোধে ২০১৯ সালে পাউবো নড়িয়া-জাজিরা পদ্মা নদীর ডান তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রায় ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জাজিরার শফিকাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় নদী খনন এবং প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১ লাখ জিওব্যাগ ফেলে বাঁধ আরও শক্তিশালী করা হয়। ২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়।
পাউবো সূত্র জানায়, চরআত্রা এলাকায় নদী খননের সময় উত্তোলিত প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট বালু বসারচর মৌজায় নদীতীরবর্তী ফসলি জমিতে সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১০ কোটি ঘনফুট বালু বিক্রির জন্য গত বছরের মার্চে উপজেলা প্রশাসন নিলাম আহ্বান করে। নিলামে তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশনের নামে অংশ নিয়ে ফরিদ আহমেদ রয়েল মাঝি ৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ওই বালু কিনে নেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্তূপ করে রাখা বালু অপসারণের অনুমতি থাকলেও গত বছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি এবং বর্তমানে শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগে জেলা প্রশাসন এক দফা সাত মাস কাজ বন্ধ রাখে। পরে চলতি বছরের মে মাসে শর্তসাপেক্ষে আবার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এবারও শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার বুকজুড়ে যতদূর চোখ যায় শুধু ড্রেজার আর ড্রেজার। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দিন-রাত চলছে বালু উত্তোলন। নদীর তলদেশ কেটে পাইপের মাধ্যমে হাজার হাজার ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে একাধিক স্পিডবোট ও ট্রলার নিয়ে মুখে গামছা বাঁধা একদল যুবক সাংবাদিকদের ঘিরে ধরে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান সজিব বলেন, ‘নদীর নাব্যতা রক্ষার প্রয়োজনে সরকারিভাবে বালু উত্তোলন হলে আপত্তি ছিল না। কিন্তু স্তূপ করে রাখা বালু সরানোর অনুমতিকে পুঁজি করে নদীর তলদেশ থেকেই বালু কাটা হচ্ছে। এতে আবারও ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
আব্বাস আলী মোল্লা নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, আমাদের এই জমিতে মরিচ, আলু হতো। আগেও বালু কেটে আমাদের সর্বনাশ করা হয়েছে। এখন আবার জমি কেটে বালু নেওয়া হচ্ছে।’
ড্রেজারে কর্মরত এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের শুধু কাজ করতে বলা হয়েছে। এগুলো বৈধ না অবৈধ, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। প্রতিদিন এক থেকে দেড় শ ড্রেজার দিয়ে বালু কাটা হয়।’
অভিযোগ অস্বীকার করে তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশনের মালিক ও নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ রয়েল বলেন, ‘নিলামের মাধ্যমে কেনা স্তূপ করা বালুই আমরা উত্তোলন করছি। নদীর তলদেশ থেকে বালু কাটা হচ্ছে না। বালু রাখা স্থানে নাব্যতা সংকট থাকায় সেখানে পৌঁছাতে চ্যানেল তৈরি করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘নদীতে বালু উত্তোলনের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন। জেলা প্রশাসন এর তদারকি করে। বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে কি না, তা জানতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমীক্ষা করতে হবে।’
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, ‘অতীতেও শর্ত ভঙ্গের কারণে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। পুনরায় শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়ার পর আবারও অভিযোগ পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ইজারা বাতিলসহ আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে।’