নরসিংদীতে মন্দির উন্নয়নের সরকারি বরাদ্দ টিআর প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক, জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কৃষক দলের সদস্যসচিব দীপক কুমার বর্মণের (প্রিন্স) বিরুদ্ধে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন তুষার দাস নামে এক যুবক।
জানা যায়, নরসিংদী পৌর শহরের বৌয়াকুড় এলাকায় অবস্থিত শীতলাবাড়ি মন্দির। সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দেওয়া নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ এপ্রিল এই মন্দিরের নামে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। শীতলাবাড়ি মন্দির উন্নয়ন প্রকল্পে বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নে দীপক কুমার বর্মনকে সভাপতি, সঞ্জয় ধরকে সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ছাত্রদলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক কিশান দাস পার্থ, সজয় দাস ও তুষার দাসকে সদস্য করে ৫ সদস্যের কমিটি দাখিল করা হয়।
পরবর্তীতে গত ৫ এপ্রিল নরসিংদী পৌর প্রশাসক, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এই কমিটির অনুমোদনও দেওয়া হয়। পরে বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দীপক কুমার বর্মনের নামে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকার চেক ইস্যু হয়। পরে গত ১১ মে চেকটি নিয়ে নিজ ব্যাংক হিসেবে জমা দিয়ে টাকা আর মন্দির কমিটির কাছে হস্তান্তর করেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির এই নেতা মন্দিরের নামে বরাদ্দ পুরো অর্থই আত্মসাৎ করেছেন। নিজের বানানো প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে নিজের আত্মীয়-স্বজনসহ কমিটি করে নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতিও করেছেন তিনি।
চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের পরও সুশীল চন্দ্র দাস ও অখিল দাসসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে বরাদ্দের টাকা পাওয়া যায়নি বলে অস্বীকার করেন দীপক।
মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হতবাক মন্দির কমিটিসহ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
অভিযোগের বিষয়ে মন্দির কমিটির সভাপতি সুশীল চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক অখিল দাস জানান, মন্দিরের উন্নয়ন কাজের জন্য নরসিংদী পৌরসভায় অনুদানের আবেদন করেছিলেন, তবে এ পর্যন্ত মন্দিরের নামে কোনো সরকারি অর্থ তারা পাননি।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগকারী তুষার দাস বলেন, ‘অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাবিত ফর্মে আমাকে না জানিয়ে আমার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে। এমনকি আমার স্বাক্ষরও জাল করে উক্ত ফর্মে আবেদন করে। আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। এমনকি টাকা উত্তোলনের পর প্রিন্স মন্দিরে কোনো টাকাও জমা দেননি। যদি টাকা জমা দিত তবে স্বাক্ষর জাল বা আমাকে না জানানোও কোনো সমস্যা ছিল না।’
‘তবে টাকা যেহেতু আত্মসাৎ করেছে, সে ক্ষেত্রে আমি এর বিচার চাই’ বলেন তুষার দাস।
পাশাপাশি জনস্বার্থে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা, আত্মসাৎ করা সরকারি টাকা উদ্ধার করে মন্দিরের তহবিলে হস্তান্তরের অনুরোধ জানান তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে দীপক কুমার বর্মণ সাংবাদিকদের বলেন, ’বরাদ্ধের টাকার কথা মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস জানেন। আপনার কোনো কিছু জানতে হলে ওনার সাথে যোগাযোগ করেন।’
মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, কে বা কারা আমাদের মন্দিরের বরাদ্ধকৃত টাকা স্বাক্ষর করে নিয়ে এসেছে। তবে এখনো আমরা কোনো অনুদানের টাকা পাইনি।’
মন্দিরের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নিন্দনীয় উল্লেখ করে জেলা বিএনপির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাওলানা নোমান আহমেদ বলেন, ‘মসজিদ-মন্দিরসহ উপাসনালয়গুলোতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। মন্দিরে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
নরসিংদী সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতির নামে চেক ইস্যু করা। পরে তিনি নিজের ব্যাংক হিসেবে চেক জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করবেন। তবে টাকা পাওয়ার পর কবে মন্দির কমিটিকে বুঝিয়ে দেবেন বা নেবেন এটা ওনাদের ব্যাপার।’
নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি, তবে লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তদন্ত করে দেখা হবে।
শাওন শাহিন/খাদিজা রুমি/