রং লেগেছে কৃষ্ণচূড়ায়। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময় থেকেই সবুজ চিরল পাতার মাঝে রক্তিম এ পুষ্পরাজি তার আভা ছড়িয়ে দিয়েছে কুমিল্লার পথে-প্রান্তরে। রোদ্রতাপের প্রখরতায় ভরা প্রকৃতিতে ফুটে থাকা কৃষ্ণচূড়া সৌন্দর্য বিলোচ্ছে পুরো নগরীর আনাচে-কানাচে। শত ব্যস্ততার মাঝেও কোলাহলপূর্ণ নগরীতে ঘুরে বেড়ানো মানুষজন উপভোগ করছে তার নির্মল সৌন্দর্য। পড়ন্ত বিকেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে বাড়তি পাওনা হিসেবে মন রাঙিয়ে নিচ্ছেন কৃষ্ণচূড়ার রঙে।
গত কয়েক দিনে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বোশেখের রুদ্র-রোষে পুড়তে থাকা প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দিতে নিজের সবটুকু রং ছড়িয়ে দিয়েছে কৃষ্ণচূড়া। নগরের প্রধান ও একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র ধর্মসাগরপাড়, নগর উদ্যান, আদালত চত্বর, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেসহ বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে, অফিস প্রাঙ্গণ কিংবা বাসভবনের সামনে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
উষ্ণ আবহাওয়ায় ছায়া দিতে বিশেষভাবে উপযুক্ত এ গাছটি সৌন্দর্য ছড়াতে ছড়াতে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি, মোগলটুলি টেলিগ্রাফ অফিস প্রাঙ্গণ, ফৌজদারি মোড়, জেলা পরিষদ ও নগর ভবনের কারাস্তার পাশে, রানির কুটির ভেতরে, স্টেশন ক্লাব প্রাঙ্গণ, জিলা স্কুল চত্বরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশে। এ ছাড়া হাউজিং এস্টেটসহ নগরীর অধিকাংশ স্থানেই দেখা মিলে রক্তরাঙা ফুলে আচ্ছন্ন কৃষ্ণচূড়াগাছের। নগরবাসী প্রাণভরে উপভোগ করছেন এর সৌন্দর্য, নিচ্ছে ছায়াও।
স্কুলপড়ুয়া মেয়ে প্রজ্ঞাকে নিয়ে ধর্মসাগরপাড়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ব্যক্তি রাফি শামস। মেয়ের আবদারে কৃষ্ণচূড়ার একটি ছোট্ট ডাল তুলে দিয়েছেন তার হাতে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলের নির্মল পরিবেশে সাগরপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা শান্তির নগরী কুমিল্লায় নান্দনিক এক সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে কৃষ্ণচূড়া। গাছের ডালে সবুজ পাতার ফাঁক গলে বেড়ে উঠা লাল রং যেন আমাদের স্বাধীন সত্ত্বার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
কেবল নগরীতেই নয়, কৃষ্ণচূড়া তার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে রাঙিয়ে তুলেছে গ্রামের সবুজ প্রান্তর, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ও বাড়ির আঙ্গিনা, পুকুর ঘাট, নদীর আলপথ। নগর ঘেঁষে বয়ে চলা গোমতী নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়াগাছ। ডালে ডালে ফুটে আছে ফুল। নাগরিক কোলাহল ছাড়িয়ে শান্ত বিকেলে অনেকেই হাজির হন গোমতীর পাড়ে; উপভোগ করেন প্রকৃতির সুনিবিড় সৌন্দর্য। শুধু গ্রাম নয়; শহরতলী ও এর আশপাশের অনেকেই ঘুরতে আসেন সেখানে। সঙ্গে থাকে পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধু-বান্ধবী। তবে কৃষ্ণচূড়ার মনোমুগ্ধর সৌন্দর্য বেশি চোখে পড়ে কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে।
ছায়াশীতল এ যুদ্ধ সমাধি ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কয়েকটি কৃষ্ণচূড়াগাছ, যা এখন ফুলে ফুলে শোভিত হয়ে নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের।
কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈশাখের খরতাপ ছাপিয়ে মনে প্রেমের শিখা জ্বালিয়ে দেওয়া রক্তাভ কৃষ্ণচূড়া কিছুটা শঙ্কাও জাগিয়েছে তাদের মাঝে। গেল কিছুদিনে নগরীতে উন্নয়নের বাহানায় যে হারে বৃক্ষনিধন হয়েছে; কোনো দিন না আবার সাবাড় করে ফেলা হয় সৌন্দর্য বিলানো এই কৃষ্ণচূড়াগাছগুলোও। তাই নগরীতে আপন শৈলীতে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো যেন পরিপূর্ণ পরিচর্যা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, এ ব্যাপারে নগর ভবন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। গ্রীষ্মের ঘামঝরা দুপুরে প্রশান্তির ছায়া-সৌন্দর্য এনে দেওয়া সবুজ চিরল পাতার মাঝে রক্তিম পুষ্পরাজি আরও অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকুক নাগরিক কোলাহল এড়িয়ে- প্রকৃতিপ্রেমী কুমিল্লাবাসীর কামনা এটাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, ‘কুমিল্লা শহরে কৃষ্ণচূড়ার যে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, তা এক কথায় অসাধারণ। এই শহরে কিন্তু আগে অনেক অনেক কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে অসংখ্য গাছ কাটা হয়েছে। সেই তালিকায় আছে কৃষ্ণচূড়াও। আমি দাবি জানাব, এখনো যে গাছগুলো টিকে আছে, সেগুলোর যত্ন নেওয়া হোক। পরিবেশ বাঁচাতে আরও বেশি বেশি গাছ লাগানো হোক এবং অবাধে বৃক্ষনিধন বন্ধ হোক।’