স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় কিংবা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে ভোট দেন না চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের কাজে ঘর থেকে বের হলেও নির্বাচনের দিন তাদের সময় কাটে ঘরে বসে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই ইউনিয়নের নারীরা ভোট দেবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
স্থানীয়রা জানান, ষাটের দশকে এই ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া বাজারের পূর্ব পাশে বসবাস শুরু করেন ভারতের জৈনপুর থেকে আসা পীর মাওলানা মওদুদ হাসান। সে সময় কলেরাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন অসংখ্য মানুষ। অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্য এলাকাবাসী দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ জন্য তারা জৈনপুরের সেই পীরের কাছে যান। কথিত আছে, ওই পীর নারীদের ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেন। বলেন, এতে মিলবে সুস্থতা। এর পর ঘর থেকে রাস্তাঘাটে বের হওয়া বন্ধ করে দেন স্থানীয় নারীরা। এমনকি পীরের আদেশ মেনে ইউনিয়নের নারী ভোটাররা কোনো নির্বাচনেই ভোটকেন্দ্রে যান না।
চাঁদপুর-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। এই নারীদের সচেতন করতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর সভা-সমাবেশ ও প্রচার চালানো হলেও তাদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ভোট না দিলেও নারীরা বাজার, মার্কেটসহ দৈনন্দিন কাজে নিয়মিত বাইরে যান। শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছেন। তবে প্রথার দোহাই দিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীই ভয়ে আসছেন না ভোটকেন্দ্রে। ভোট না দেওয়ার তালিকায় মুসলিম ছাড়াও রয়েছেন সনাতন ও খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মের নারীরাও।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই দীর্ঘদিনের প্রথা ভাঙতে উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন ও ইউনিয়ন পরিষদ। নারীদের ভোটকেন্দ্রে আনতে আলাদা সচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নারী ভোটার রুজিনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের পরিবারের কোনো নারী কখনো ভোট দেয় না। হুজুর বলে গেছেন ভোট না দিতে। তাই আমরা তার আদেশ মানছি। ভবিষ্যতে যদি মানুষের মন পরিবর্তন হয়, তা হলে নারীরা ভোট দিতেও পারে।’
স্থানীয় ভোটার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে স্থানীয় ও জাতীয় সব নির্বাচনে নারীরা ভোট দেন না। কিছু দলীয় নারী নেতা-কর্মী মাঝে মাঝে কেন্দ্রে এলেও অনেকেই ভোট দেন না। এ বিষয়ে সচেতনতামূলক সভা হলেও ফল খুব একটা আসে না।’
ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুফতি আনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ইসলাম ধর্মে পর্দা ও হিজাব পালনের কথা বলা হলেও ঘরের বাইরে বের হয়ে তার নাগরিক অধিকার হারানোর কথা বলা হয়নি। দেশের সাংবিধানিক অধিকার আদায় করার অধিকার রয়েছে সব জনগণের। নারীও সেই জনগণের অন্যতম একটি অংশ।’
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহসিন হাসান বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি উঠান বৈঠক করেছি। আগের তুলনায় নারী ভোটাররা কিছুটা সচেতন হচ্ছেন। ভবিষ্যতে তারা ভোট দিতে আসবেন বলে আশা করি।’
চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, ‘যোগদানের পরই বিষয়টি জানতে পারি। কয়েকবার চেষ্টা করেও নারীদের ভোটকেন্দ্রে আনা যায়নি। এখনো চেষ্টা চলছে, যাতে নারীরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন।’
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমি বিস্মিত হয়েছি। দ্রুত ওই ইউনিয়নে গিয়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলব। ভোট একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। নারীদের সচেতন করে ভোটকেন্দ্রে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে।’
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) এম এ হান্নান ও হাজী মোজাম্মেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিন ও জাকির হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, জাতীয় পার্টির মাহমুদ আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আল্লামা মুকবুল হোসাইন, গণফোরামের মুনীর চৌধুরী এবং ইসলামী ফ্রন্টের আব্দুল মালেক বুলবুল।