পণ্যের দাম বাড়ল না কমল তাতে তাদের কিছুই যায়-আসে না। তারা শুধু লাভের ভাগীদার। চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে কমিশন এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য বেচাকেনায় কোনো মূলধনও বিনিয়োগ করতে হয় না আড়তদারদের। উৎপাদক কিংবা আমদানিকারকের পণ্য বিক্রি করে শুধু লাভের অংশটা ভোগ করেন তারা। ব্যবসায়ীরা একে কমিশন এজেন্ট বললেও সাধারণ ভোক্তারা একে পণ্যের দালালী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা বলছেন, ‘ব্যবসা করতে হলে পণ্য কিনে তা বিক্রি করতে হবে। এখানে কমিশন এজেন্টরা অন্যের পণ্য বিক্রি করে কমিশনের অংশ নিজের কাছে রেখে বাকিটা পণ্যের মালিককে দিয়ে দেন। এখানে তাদেরকে কোনো বিনিয়োগ করতে হয় না। তাই একে ব্যবসা বলার সুযোগ নেই। এটি একটি অবৈধ ব্যবসা। এর মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়ছে। যা বন্ধ হওয়া উচিত।’
জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, পাহাড়তলী, রিয়াজুদ্দিন বাজারের মতো বড় বড় ভোগ্যপণ্যের বাজারে কমিশন এজেন্ট প্রথায় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়ে আসছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিকেজি পেঁয়াজে ৭০ পয়সা, আলুতে ৫০ থেকে ৮০ পয়সা, ধনিয়া, মরিচ ও হলুদে ১ টাকা, প্রতি পিস নারিকেলে ১ টাকা, প্রতিকেজি আদা ও রসুনে ১ টাকা ৫০ পয়সা কমিশন নিচ্ছেন। কমিশন এজেন্ট প্রথায় পাইকারি ব্যবসায়ী আগে নিজের পার্সেন্টেজ ঠিক করে নেন। আড়তদার বা আমদানিকারকের লাভ-লোকসান তারা চিন্তা করেন না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) দাবি করছে, ব্রিটিশ আমল থেকে চলমান এজেন্টস প্রথা বহাল রাখার নানা যুক্তি দেখালেও এই যুক্তির পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ ও আইনগত ভিত্তি দেখাতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। কমিশন এজেন্টস প্রথা, ডিও/স্লিপ প্রথার মতো অবৈধ চর্চার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একটি চক্র বিপুল অংক হাতিয়ে নিচ্ছেন। ওই চক্রটি একটা সময় আমদানি করা পেঁয়াজ নিয়ে সক্রিয় হলেও বর্তমানে আলু, মসলা, সবজিসহ নিত্যপণ্যের অনেক জায়গায় কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই বিপুল অংক হাতিয়ে নিচ্ছেন। ওই কমিশন এজেন্টস ও স্লিপ প্রথা চলমান থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে কারসাজি বন্ধ, মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতৎপরতা বন্ধ করা যাবে না। দ্রুত কমিশন এজেন্টস ও ডিও/স্লিপ প্রথার মতো বিষয়গুলো বন্ধ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাইকাররা জানিয়েছেন চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নাকি বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। কিন্তু দাম বাড়লেই তারা পণ্যের মালিক হয়ে যান, আবার বাজারে অভিযান চালালে তারা শুধু গুদাম ভাড়ার অংশ পান বলে দাবি করেন। আর সব দোষ চাপান বেপারি ও কৃষকের ঘাড়ে। তাই আড়তদার ও কমিশন এজেন্টস এই দ্বৈত ভূমিকার কারণে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সরবরাহ কমিয়ে দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবিলম্বে ব্যবসা-বাণিজ্যে সংস্কার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতৎপরতা বন্ধ করে অবিলম্বে কমিশন এজেন্টস ও স্লিপ প্রথার মতো ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। কোনো প্রকার বেচাকেনার রসিদ ছাড়া কোনো পণ্য বিক্রি করা যাবে না। একই সঙ্গে কৃষকদের মাঝে দাদন বা অগ্রিম টাকা দিয়ে পণ্য কেনা বন্ধ করতে হবে।
এদিকে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, একজন আমদানিকারক পণ্য আমদানি করার পর সে কমিশন এজেন্টের কাছে পণ্য ছেড়ে দেন। কমিশন এজেন্ট ওই পণ্য বিক্রি করে তার কমিশনের অংশ রেখে বাকি টাকা আমদানিকারককে ফেরত দেয়। এতে যদি আমদানিকারকের লাভ বা লোকসান হয়, তার দায় কমিশন এজেন্ট নেয় না। এতে আমদানিকারক লাভ হলে ভালো, আর লোকসান হলেও তার আমদানি খরচটা তুলে নিতে পারে। কিন্তু কমিশন এজেন্ট না থাকলে আমদানিকারক ওই পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। এতে করে তারাও পুনরায় আমদানিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে দিন দিন উদ্যোক্তার হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
রিয়াজুদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তেই পণ্যগুলো থাকে। সেখান থেকে প্রতিকেজি ৬ টাকা ২৫ পয়সা কমিশনে সবজি এনে চট্টগ্রামের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। মূল কারণ হলো কৃষকের কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগীরা সব ধরনের সবজি কিনে নেন। কমিশন এজেন্ট ছাড়া তাদের সবজি বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। এ পদ্ধতিতে পূর্বপুরুষদের আমল থেকে ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। এটাকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই।
রিয়াজুদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক শিবলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি কৃষক থেকে পণ্য কিনে আনতে পারি না। কারণ আমরা যদি সবজি মাঠে ফলানোর সময় কৃষককে টাকা দিয়ে দিই, তা হলে কৃষক আর সবজির যত্ন নেবে না। আর আমাদেরও ওখানে থেকে গিয়ে সেটা দেখভাল করার সুযোগ নেই। তাই কৃষক সবজি ফলিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করেন। আমরা কমিশনের ভিত্তিতে সেই সবজি বিক্রি করি। এতে কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগী উভয়ই লাভবান হন। আর এ ব্যবসা কোনোভাবেই অবৈধ হতে পারে না।’
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে কমিশন এজেন্ট প্রথায় ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। এটা তো ব্যবসায়েরই একটি অংশ। তাই এ প্রথাকে অবৈধ বলা যাবে না। আর সরকার যদি এ প্রথা মেনে ব্যবসা পরিচালনায় বাধা দেয়, তা হলে আমাদের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ব্যবসা মানেই হলো সেখানে লাভ, লোকসান আর ঝুঁকি থাকবে। কিন্তু কমিশন এজেন্ট ব্যবসায় তো কোনো ধরনের বিনিয়োগই নেই। কাজেই এটাকে ব্যবসার সংজ্ঞায় তো আর ফেলা যায় না। আমরা ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে বৈধতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছি।