পবিত্র ঈদুল আজহায় এবার চট্টগ্রামে ৪ লাখ ১৫ হাজার পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। চামড়াগুলো নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় বিভিন্ন আড়তে মজুত আছে। তবে চামড়া কিনে লাভবান হলেও আড়তদাররা সেগুলো বিক্রি করা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ, ট্যানারি মালিকরা এখন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ করছেন না। আড়তদাররা জানিয়েছেন, ন্যায্যদামে চামড়া বিক্রি করতে না পারলে তারা লোকসানে পড়বেন।
জানা গেছে, এ বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে আকারভেদে ২৫০ থেকে ৬০০ টাকায় চামড়া সংগ্রহ করেছেন। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা উপযুক্ত দরে চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। তাই চামড়ার ঠাঁই হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। নগরের বিভিন্ন এলাকার সড়কের ওপর থেকে প্রায় এক লাখ চামড়া সরানোর কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। আবার লাভ না পেয়ে কেউ কেউ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন। অনেক কোরবানিদাতা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে এতিমখানা ও মাদ্রাসায় দান করেছেন। ওই চামড়া আড়তদারের কাছে বিক্রি করতেও হিমশিম খেতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির তথ্য মতে, এই সমিতির সদস্যভুক্ত ১১২ জন আড়তদার রয়েছেন। সদস্যভুক্ত থাকলেও বর্তমানে চামড়া আড়তদারের সংখ্যা ৩০ জনে ঠেকেছে। তারাই এবার চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। আড়তদাররা দাবি করছেন, তারা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় আকারের গরুর চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ও ছোট আকারের গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে কিনে নিয়েছেন।
তারা (আড়তদাররা) জানিয়েছেন, বর্তমানে নগরীর আতুরার ডিপো, কালুরঘাট, হালিশহর, বিবিরহাটসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় চামড়াগুলো লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। বর্তমানে তাদের লাভ-লোকসান সবই নির্ভর করছে ট্যানারির ওপর। ট্যানারি মালিকরা উপযুক্ত দামে চামড়া কিনলে তারা লাভবান হবেন, অন্যথায় দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গুটাতে হবে।
জানা গেছে, ১৯৯০ সালের দিকে চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু চামড়ার দরপতনে ব্যবসায় লোকসান ও ইটিপি (বর্জ্য পরিশোধনাগার) স্থাপন করতে না পারায় বিভিন্ন সময়ে ২১টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে রিফ লেদার নামে একটি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ৫০ হাজার চামড়া চট্টগ্রামের আড়তদারদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে।
বাকি চামড়া বিক্রির জন্য ঢাকার ট্যানারিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। ঢাকায় বর্তমানে ২২৫টি ট্যানারি রয়েছে। এর মধ্যে খোকন লেদার, ভুলুয়া ট্যানারি, সালমা ট্যানারি, মহুয়া ট্যানারি, পান্না লেদারসহ ছোট-বড় প্রায় ২০টি ট্যানারি চট্টগ্রাম থেকে চামড়া কিনে নেয়। তাই এবারও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে চান চট্টগ্রামের আড়তদাররা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি রিফ লেদারের কাছে ৫০ হাজার চামড়া বিক্রি করেছি। বাকি চামড়া বিক্রি করতে ঢাকার ট্যানারির দিকে তাকিয়ে আছি। এখন পর্যন্ত খোকন লেদারসহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চামড়া কিনতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আশা করছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও যোগাযোগ করবে। আমরা চিন্তায় সময় পার করছি। কারণ আমাদের লাভ-লোকসান নির্ভর করছে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নঈম উদ্দিন হাছান চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘চামড়া খাতের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ পদক্ষেপ। এই খাতকে এগিয়ে নিতে হলে দেশীয় ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া এবং চামড়াজাতীয় পণ্যে বাংলাদেশকে একটি টেকসই সরবরাহকারী রাষ্ট্র হতে হলে দেশীয় কাঁচা চামড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ আন্তর্জাতিক মানের হওয়া জরুরি।’
জানা গেছে, চট্টগ্রামের রিফ লেদার ও ঢাকার এপেক্স ফুটওয়্যারের কাছে এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সনদ আছে। এরকম আরও ৪০টি ট্যানারি প্রতিষ্ঠান যদি এলডব্লিউজি সনদ পায়, তাহলে বর্তমানে চলমান সংকট কেটে যাবে। কারণ এলডব্লিউজি সনদ থাকলে ব্যাংকগুলো লোন দিতে প্রাধান্য দেয়। পাশাপাশি বড় বড় বায়াররা চামড়া কেনার জন্য অর্ডার দেয়। এতে চামড়ার বিক্রি বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হবে।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সাবেক নেতা মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের দেশে এলডব্লিউজি সনদধারী ট্যানারির সংখ্যা একেবারেই কম। আমরা এখন ৩০ জন আড়তদার আছি। এলডব্লিউজি সনদধারী ট্যানারির সংখ্যা বাড়লে আমরা টিকে থাকব এবং চলমান ভোগান্তিও কেটে যাবে।’