চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে দফায় দফায় বাড়ছে দেশি পেঁয়াজের দাম। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে পণ্যটির দাম শতক পেরিয়েছে সপ্তাহখানেক আগেই। তবে তিন সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজে দাম বেড়েছে চারবার। অন্যদিকে খুচরায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ আকারভেদে বিক্রি হয়েছে ৬২ থেকে ৬৫ টাকায়। তবে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করে। গত ১৭ অক্টোবর কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হয়। গত ১ নভেম্বর কেজিতে আকারভেদে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়। গত ৬ নভেম্বর পেঁয়াজের দাম শতক পেরিয়ে যায়। সেদিন কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়ে পণ্যটি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হয়। সর্বশেষ ১১ নভেম্বর কেজিতে আরও ৫ টাকা বেড়ে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফরিদপুর ও পাবনা থেকে দেশি পেঁয়াজ আসছে। সেখানে দাম বেড়েছে। কিছু মজুতদারের কারণে পণ্যটির দাম এতটা বেড়েছে। প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে পেঁয়াজের দাম বাড়ার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ সময় আমদানি হতো বলে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকত। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অন্তত এক মাসের জন্য পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। মাসখানেক পর দেশি উৎপাদিত মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে। তাই ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে যা করার এখনই করতে হবে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ একেবারে ভালো তা বলা যাবে না। সরবরাহে যা আছে সেটা দিয়ে কোনোরকম চাহিদা মেটানো যাচ্ছে। তবে দামটা বেড়েছে। সামনে দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজে চাহিদা মিটবে। এটা বাজারে আসতে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। তাই এই সময়ের জন্য অন্তত আমদানি অনুমতি দেওয়া উচিত।
এদিকে পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। বর্তমানে ক্রেতাকে এক কেজি দেশি পেঁয়াজ কিনতে গুনতে হচ্ছে ১২০ টাকা। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ভোক্তার খরচ বেড়েছে ৩০ টাকা।
নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয়, ভোগান্তি বেড়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এটা খুবই দুঃখজনক। শেষমেষ ২০১৯ সালের নভেম্বরের মতো ২৫০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনতে হয় কি না, সেই ভয়টা হচ্ছে।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এখানে সিন্ডিকেট হয়েছে, এটা স্পষ্ট। দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছে। কিন্তু বাজারে তো কঠোর তদারকি ব্যবস্থা দেখছি না। বাজার তদারকিব্যবস্থা জোরদার করে পণ্যটিতে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘আমরা খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের আড়তে অভিযান পরিচালনা করেছি। একজন কৃষক খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ বিক্রি করার সময় অন্তত একটা সাদা কাগজে তার নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, পেঁয়াজের পরিমাণ, কত টাকায় বিক্রি করল- এসব কিছুই দেন না। সাদা কাগজে এসব তথ্য দিলে এটা আমরা ডকুমেন্ট হিসেবে পেতাম। তখন বাজারে একটা স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আমাদের জন্য সহজ হবে।’
চলতি সপ্তাহে দাম না কমলে আমদানির সিদ্ধান্ত
গত রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পেঁয়াজের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দিন বলেছেন, দেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কোনো সংকট নেই, যথেষ্ট মজুত রয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক না হলে আমরা আমদানির অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেব। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ২ হাজার ৮০০ আবেদন পড়েছে। আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে বাজারের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে না এলে আমদানি অনুমোদন ইস্যু করা হবে।
যা বলছেন আমদানিকারক
হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. মোবারক হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক না হলে আমদানির অনুমতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার মানে এ সপ্তাহেও পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমদানি অনুমতি পাওয়ার ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। এটা সরকারই ভালো জানে।