শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল অত্যধিক সুরক্ষিত জায়গা। আর সেই সুরক্ষিত এলাকা থেকেই ঘটেছে ভয়ংকর চুরির ঘটনা। গত ৩ সেপ্টেম্বর কাস্টম হাউসের লকার থেকে সোনা চুরির বিষয়টি নজরে আসে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের। শুল্ক বিভাগের তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই সোনা বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয়েছে। গুদামের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে সোনা আটকের রসিদ (ডিএম) মোতাবেক দেখতে পান ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটক করা সোনা থেকে ৫৫ কেজি ৫১ গ্রাম সোনা চুরি হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
টাস্কফোর্স কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, কিছু সোনা ব্যবসায়ী দেশের মধ্যে নিজস্ব একাধিক শোরুমে সোনার অলংকারের রমরমা ব্যবসা করছেন। সরকার সোনা আমদানির সুবিধা দিলেও তারা তা গ্রহণ করেননি। এনবিআর কাস্টম হাউসের গুদামে কর্মরত কর্মচারীদের অনৈতিক প্রলোভন বা সুবিধা দিয়ে তারা সোনা চুরি করিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে কমিটি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব সোনা চুরির সঙ্গে অসাধু সোনা ব্যবসায়ীদের চক্র জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। আগের ঘটনায় এদের সম্পৃক্ততা আছে কি না তাও এই কমিটি দেখছে।
অনেক ব্যবসায়ী তাদের সোনার উৎস কোথা থেকে আসে অর্থাৎ তাদের শোরুমের সোনা কীভাবে ক্রয় করে- এই প্রশ্ন করা হলে তার কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি টাস্কফোর্স কমিটির কাছে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের ওপরেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তথ্য বলছে, গুদামে অনেক লকার থাকলেও সোনা চুরি হয়েছে একটি লকার থেকে। চুরির পর এনবিআরের ছয় কর্মকর্তাকে নিয়ে টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি পৃথকভাবে তদন্ত পরিচালনা করছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম কমিটি গঠনের পর ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও তদন্তের প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল এই তিন বছরে কে বা কারা কাদের কাছ থেকে সোনা সংগ্রহ করেছে, এসব তথ্য জোগাড় করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখার কারণে তদন্তের স্বার্থে সময় লাগছে বলে তিনি মনে করছেন।
ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার এ কে এম নুরুল হুদা বলেন, “চুরি হওয়ার আট দিন আগে গুদামটি অটোমেশনের কাজ শুরু করেছিলাম। এই কাজের অংশ হিসেবে গুদামে থাকা সোনা গণনার কাজ শুরু করি। আমার ধারণা, সোনা চুরির ঘটনা আগেই ঘটেছে। গুদামের অটোমেশনের কাজ শুরু হওয়ায় সেটা ধরা পড়বে, তাই লকার ভাঙার ‘নাটক’ তৈরি করা হয়েছে।”
এনবিআরের এক কর্মকর্তা খবরের কাগজ-কে বলেন, ৫৬ কেজি সোনা কম না। এত বেশি পরিমাণ সোনা নিয়ে তো আর ঘরে রেখে দেবে না। যারা নিয়ে কাজে লাগাতে পারবেন তারাই এ কাজে জড়িত। কিছু অসাধু সোনা ব্যবসায়ী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে
চোরাই পথে সোনা এনে রমরমা ব্যবসা করলেও সরকারকে এক টাকারও রাজস্ব দেন না। অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র এ কাজে জড়িত বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিমানবন্দরের ভেতর চারটি শিফটে পালা করে পাহারায় ছিলেন কর্মীরা। এখন প্রশ্ন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্থান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কীভাবে এত সোনা পাহারা বসিয়েও ঠিক রাখা যায়নি। যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ। দায়িত্ব, কর্তব্য ও স্বচ্ছতার জায়গায় কর্তৃপক্ষ কতটা উদাসীনতা দেখিয়েছেন তা ঘটনাটি দেখেই প্রতীয়মান হয়। এসব বড় বড় অপরাধের জন্য তদন্ত কমিটি হয়, মামলা হয় কিন্তু তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার অন্ধকার তিমিরেই রয়ে যায়। অপরাধীরা অপরাধ ঢাকতে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে। রাষ্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ জায়গা থেকে সোনা চুরির ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাই না। যে বা যারাই এর সঙ্গে জড়িত হোক না কেন, শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের অপরাধ কমবে না।