বিগত ১৫ বছরে দেশের মন্ত্রী-এমপির সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র দেখলেই মনে হয় তারা হয়তো আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন। এ চিত্র এক আজব দেশের রূপকথার গল্পের সঙ্গেই তুলনীয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট হলে হয়তো বাস্তব এ গল্পগুলো অতটা সামনে আসত না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ১৮ জন শতকোটি টাকার মালিক। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৮৯৬ প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছে দুর্নীতিসংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজস্ব কার্যালয়ে ‘নির্বাচনি হলফনামায় তথ্যচিত্র, জনগণকে কী বার্তা দিচ্ছে?’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানায়, প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা ৫৭১। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৫ জন কোটিপতি প্রার্থী। এ ছাড়া ১৬৪ জন তাদের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন কোটি টাকার বেশি।
সরকারের একজন মন্ত্রী বিদেশে ১৬ কোটি ৬৪ লাখ পাউন্ড বা ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু সেই মন্ত্রী তার হলফনামায় এ তথ্য দেননি।
কোটিপতির হিসাব করা হয়েছে নগদ ও ব্যাংকে জমা টাকা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ, সোনাসহ বিভিন্ন অস্থাবর সম্পদের ভিত্তিতে। জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পদ এই হিসাবে আসেনি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ১২ নং অনুচ্ছেদের (৩ খ) দফা অনুসারে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার মাধ্যমে মোট ৮ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। হলফনামায় দেওয়া এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ও আয়ের উৎস, মামলার বিবরণী, প্রার্থীর নিজের এবং তার নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়, সম্পদ ও দায়দেনা। এসব তথ্য ভোটারদের মধ্যে দ্রুততার সঙ্গে প্রচারের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। যাতে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২৭৪ জন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটিপতির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২০২ জন, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২২ জনে এবং এবার ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটিপতির সংখ্যা সর্বোচ্চ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭১ জনে।
হলফনামায় প্রকাশিত প্রার্থীদের সম্পদের অস্বাভাবিক স্ফীতি রীতিমতো বিস্ময়কর। এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে এটাই নিউ-নরমাল যে, কিছু মানুষ একেবারে হাজার হাজার কোটি টাকার ওপরে বসে থাকেন; আর কিছু মানুষ প্রতিদিন কীভাবে দিন চালাবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবে।’
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রার্থীর টাকা উপার্জনের বিষয়টি দেখতে হবে। অর্জিত টাকা বা সম্পদের বিপরীতে যথাযথভাবে সরকারকে কর দেওয়া হয়েছে কি না বা আয়ের স্বচ্ছতা আছে কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। অপর একটি বিষয় হলো, নির্বাচনি প্রচারের ব্যয়। এ ব্যয় কীভাবে করা হচ্ছে তা দেখতে হবে।’
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে টিআইবি যে তথ্য পেয়েছে তাতে দেখানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি। স্বতন্ত্রদের এ হার ৪৭ শতাংশ প্রায়। জাতীয় পার্টির ২২ শতাংশ কোটিপতি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীর হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনেকটা দায়সারা গোছের। ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণমূলক জায়গায় রেখে বাকি তথ্য দেওয়া হচ্ছে। সম্পদের বিকাশ যদি বৈধভাবে হয়ে থাকে, তাতে কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু অবৈধভাবে হলে এবং তথ্য গোপন করা হলে জবাবদিহি প্রয়োজন।’
দুর্নীতি করে যারা সম্পদ গড়েছেন তারা দেশের কল্যাণে কী ভূমিকা রাখবেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় রয়েছে। রাজনীতি এবং ব্যবসা এখন মিলেমিশে একাকার। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ বেশ কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে রাজনীতিতে যারা প্রবেশ করছেন, তারা অনেক ব্যবসার সুযোগ করে নিচ্ছেন। আইন ও নীতি প্রণয়নে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সে জন্য হলফনামায় দেওয়া প্রার্থীদের সম্পদের হিসাব আদৌ সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের সম্পদের উৎসের স্বচ্ছতা জানার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও নির্বাচন কমিশনকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে এ বিভাগগুলো নিষ্ক্রিয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া প্রার্থীদের নীতিনৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করে নির্বাচনে জয়ী হওয়া দেশের জন্য সুখকর হবে না। অবৈধ সম্পদ অর্জন রাজনীতিবিদদের আদর্শ হতে পারে না। তাই যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সম্পদের উৎসের অনুসন্ধান করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।