বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়, এটা সত্য। কিন্তু এর থেকেও ধ্রুব সত্য যে, এর প্রভাবে এ দেশের তরুণ-তরুণী এমনকি সব শ্রেণির মানুষই একরকম বন্দিত্বের গ্লানি ভোগ করছে। সাইবার প্রতারণা ও বিশ্বায়নের হাত ধরে প্রবেশ করেছে গ্লোবাল ভিলেজে। দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নারী সাইবার ও অন্যভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ নারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। বাকিরা চল্লিশোর্ধ্ব। আর ভুক্তভোগীদের ৪০ শতাংশ ঢাকা বিভাগ বা ঢাকার আশপাশের বাসিন্দা। বাকি ৬০ শতাংশ নারী অন্যান্য বিভাগের। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এর একটি সূত্র খবরের কাগজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র মতে, ২০২৩ সালে ‘উইমেন সাপোর্ট’ সেন্টারে ১৫ হাজারের বেশি লিখিত অভিযোগ পড়ে এবং ফোনের মাধ্যমে আরও অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, আইডি হ্যাক, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও করে ব্ল্যাকমেলিং, ইমপার্সোনাল ব্ল্যাকমেলিং, ছদ্মবেশে হয়রানি, কৌশলে ফোন নম্বর নিয়ে হয়রানি, ক্রেডিট কার্ডে প্রতারণা, বিকাশ প্রতারণা, অনলাইনসহ নানা ধরনের প্রতারণা।
প্রতারণা এখন চলছে হরেক রকমের। এসব অপরাধের নতুন উপকরণ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি সাইবার স্পেসে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নারীদের ছবি ব্যবহার করে তাদের এক ধরনের মানসিক নির্যাতনের মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ছদ্মবেশধারীদের মাধ্যমে নারীরা ইমপারসোনাল ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার বেশি হচ্ছেন। এ ছাড়া সাইবার বুলিং, আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো ও মোবাইল হ্যারাসমেন্ট, অনলাইন, ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে অভিযোগও বিস্তর। ইদানীং টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করে কোমলমতী শিশুদেরও এ জালে জড়িয়ে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে।
ছদ্মবেশে হাজার হাজার মানুষ ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা করছে। এতে নারীরাই বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে টিকটক মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে সারা দেশে মানব পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে একটি চক্র। এ চক্রের সদস্যরা গত বছরে ভারতে প্রায় ২ হাজারের বেশি তরুণীকে পাচার করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীরা ব্যাপকভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সের নারীরাই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক পরিচয় বা কাউকে না চিনে বন্ধু বানানো ঠিক নয়। এসব প্রতিরোধে নারীদের এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক হেনস্তার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ না করে চেপে যান। এতে সাইবার অপরাধীরা আরও অপরাধের সুযোগ পায়। দেশে যত সাইবার অপরাধ হয়, তার সব অভিযোগ পুলিশের কাছে আসেও না। বিচিত্র ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, অনেক মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। এসব অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা দিতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধেও বিশেষ করে ছাত্রীদের সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা দিলে এসব অপরাধ অনেকটা কমে আসবে।’
সাইবার প্রতারণা বন্ধে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে সামনে আসতে চান না। এ প্রবনতা অপরাধকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবে সমাজে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ভুক্তভোগীদের এজন্য দরকারি আইনি সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ টিমকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। সাইবার অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি সাইবার প্রতারণা বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।