সরকার গত শুক্রবার পেঁয়াজসহ ২৯টি পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছে। কৃষি বিপণন আইন ২০১৮-এর ক্ষমতাবলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২৯টি নিত্যপণ্যের যৌক্তির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারা বাজার স্থিতিশীল করার জন্য উৎপাদক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কোন পণ্য কত দামে বিক্রি করা যাবে, তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার পর খবরের কাগজ প্রতিবেদন টিম কয়েকটি বাজার ঘুরে এর উল্টো চিত্র দেখতে পায়। অর্থাৎ যে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তার যথাযথ প্রতিফলন নেই বাজারে। বরং নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজে ২৫ টাকা বা ৩৮ শতাংশ বেশি, আলুতে ১২ টাকা বা ৪৩ শতাংশ, খেজুরে ১৭৫ টাকা বা ৯৫ শতাংশ বেশি নেওয়া হচ্ছে ভোক্তাদের কাছ থেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো কৃষি মন্ত্রণালয়ও গত শুক্রবার পেঁয়াজের কেজি ৬৫ টাকা বলে জানিয়েছে। কিন্তু পেঁয়াজের ভরা মৌসুম শুরু হলেও সেই দরের ধারেকাছে নেই বিক্রেতারা। অন্য পণ্যের মতো আলুও বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরকার খুচরা পর্যায়ে ২৮ টাকা বিক্রির কথা বললেও বাজারে তা ধারেকাছে নেই।
খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পাইকারি বাজারে পণ্যের মূল্য সামাল না দিলে তা খুচরা বাজারে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তারা অভিযোগ করে বলছেন, সরকার দাম বেঁধে দিয়েছে তা জানেন না বেশির ভাগ বিক্রেতা। রোজার আগে হলে সুফল পেতেন ভোক্তারা। সড়কে চাঁদাবাজির বিষয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এলসি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কথা কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বারবার বলে আসছেন। এর আড়ালে বাজার কারসাজি বা সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার মাধ্যমে একধরনের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। দাম নির্ধারণ মানে এমআরপি দামে পণ্য বিক্রি করা। নির্ধারিত দামের বেশি দামে কেউ বিক্রি করতে পারবে না। পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আমাদের দেশে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় খুব কম। সিদ্ধান্ত যেমন নিতে হবে, তেমনি এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও করতে হবে। এদিকে প্রতিযোগিতা কমিশনও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পণ্যের দামে লাগাম টানতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেগুলো ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে না। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব বেশি কাজে আসেনি। কারণ আমাদের সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান খবরের কাগজকে বলেন, সরকার দেশের দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ২৯টি পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছে। দেশে বিদ্যমান আইনের আলোকে সরকার এসব পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী পণ্যমূল্যের বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা ন্যায্য প্রতিযোগিতার অভাব। এ কারণেই ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না।
পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরবরাহব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। সরবরাহ সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে না পারলে পণ্যের দাম বেঁধে দিলেও খুব একটা কাজে আসবে না। এখানে কোনো পণ্য আমদানি বা বিক্রি করতে তালিকাভুক্ত হতে হবে। ইচ্ছা করলেও যে কেউ যেকোনো পণ্য আমদানি বা বিক্রি করতে পারবে না। অর্থাৎ দাম শুধু নির্ধারণ করলেই হবে না, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করলে ভোক্তারা কম দামে পণ্য পাবে। অর্থাৎ বিক্রেতাদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো জরুরি। সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে বাজারব্যবস্থায় সুশাসন ফিরিয়ে আনতে পারলে বেঁধে দেওয়া পণ্যের দাম নিশ্চিত করা সহজ হবে।