ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদের প্রথম ধাপের ভোট গত বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি বেশি লক্ষ করা যায়। কিন্তু এবার তা খুব একটা চোখে পড়েনি। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ ভোটে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। খবরের কাগজের তথ্য বলছে, ১১ হাজার ৪০০ কেন্দ্রের ৪০টিতে সহিংসতা, আহত অর্ধশতাধিক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। এমন ৩৪টি ঘটনায় ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
দুটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ভোটের হার ৩০-৪০ শতাংশের মাঝামাঝি হতে পারে। নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। অপরদিকে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনের ভুয়া নাটকও দেশের মানুষ বর্জন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি দাবি করেন, ১৩৯ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো কোনো কেন্দ্রে একজন ভোটারও আসেননি।
তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ। তখন পাঁচ ধাপে উপজেলা ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারদের নির্বাচন-বিমুখতা গণতন্ত্রের জন্য কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না বলে তৎকালীন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা মন্তব্য করেন। এর আগে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬১ শতাংশের মতো। সে বছর ছয় ধাপে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেড় দশক আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ গত দুই নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমেছে।
২০১৯ সালে প্রথমবার বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো উপজেলা নির্বাচন বর্জন করে। এর পর থেকেই ভোটারের উপস্থিতি কমতে থাকে। এবার দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ৭৫ জন অংশ নিয়েছেন। বিএনপি তাদের দল থেকে বহিষ্কারও করেছে। এবারে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর তালিকা একটু বেশিই হবে। বিএনপি ছাড়াও তাদের জোটসঙ্গী দলগুলো- জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও সিপিবির মতো দলগুলো নির্বাচন অর্থবহ হবে না জানিয়ে এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক মনে না হওয়ায় কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতাশা ব্যক্ত করেছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক মহলে একধরনের হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।
এবারের স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে চার ধাপে। এরপর ২১ মে দ্বিতীয় ধাপে ভোট হবে ১৬০টি উপজেলার, ২৯ মে তৃতীয় ধাপে ১১০ উপজেলায় এবং ৫ জুন চতুর্থ ধাপে ৫০টির বেশি উপজেলায় ভোট গ্রহণ করা হবে।
নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পদ্ধতিতে জনগণের আস্থা ফেরানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে কমিশন চেষ্টা চালিয়েছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি ভোটার উপস্থিতি এবং দলীয় অংশগ্রহণ বাড়ানোটা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। বেশ কয়েক বছরের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চালচিত্র এটাই ইঙ্গিত দেয়। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া করা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থিতার জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার মতো কিছু বিধি নির্বাচন কমিশন সংশোধন করেছে, যা ডামি নির্বাচন বা বিনা ভোটের নির্বাচন এড়াতেই এসব সংশোধনীর প্রয়োজন হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এ দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত ও গতিশীল করতে অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বিকল্প নেই। পরবর্তী ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে কমিশন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই প্রত্যাশা।