স্বাস্থ্য খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দক্ষতা ও দুর্নীতির ভয়ে অনেক সময় খরচ করতে ব্যর্থ হতে হয় এই বিভাগের কর্মকর্তাদের। স্বাস্থ্য অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা প্রতিবছরের অব্যাহত অর্থ ফেরত দেওয়াকে এই খাতের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যখন স্বাস্থ্য খাতের সংকটের কথা বলা হয়, তখনই পর্যাপ্ত বাজেট না পাওয়ার অজুহাত আসে। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়, তা তারা খরচ করতে পারে না।
সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট স্বাস্থ্য খাতের অর্থ বরাদ্দ ও খরচ নিয়ে যৌথভাবে এক গবেষণা পরিচালনা করে। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অর্থ বরাদ্দ খরচের খাতওয়ারি চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোনো খাতেই বরাদ্দ করা অর্থ খরচ করতে পারেনি। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যা মোট জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ। যদিও সংশোধিত বাজেটে কিছুটা কমে যায়। আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা জানান, চলতি অর্থবছরে আগের তুলনায় খরচ কিছুটা বেশি করা হয়েছে। কারণ এ বছর স্বাস্থ্য খাতের পঞ্চবার্ষিকের শেষ বছর। ফলে গত পাঁচ বছরে যে কাজগুলো আটকে ছিল, তা এই মেয়াদের মধ্যে শেষ করা না গেলে নতুন পঞ্চবার্ষিকের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ এখনো কম। আবার যা বরাদ্দ রয়েছে তাও খরচ করতে ব্যর্থ হয়। এটা খুবই দুঃখজনক। এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতের কার্যকর কোনো উন্নতি ঘটবে না। খরচ করতে না পারার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাশাপাশি রয়েছে দরপত্রের জটিলতাও। অডিট প্রক্রিয়াতেও রয়েছে নানা ঝামেলা। অনেক কর্মকর্তা নানা ধরনের অনিয়মের আশঙ্কায় থাকেন। তারা ভয়ে তড়িঘড়ি করে কোনো কেনাকাটায় যেতে চান না; বরং টাকা ফেরত দেওয়াই শ্রেয় মনে করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে কেবল বরাদ্দ আর খরচের টানাপোড়েনে থাকলেই হবে না। এর ঊর্ধ্বে উঠে আরও বড় আঙ্গিকে কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ক্ষেত্রবিশেষে সংস্কার দরকার। তবে এটা ঠিক যে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট কম। এটা অবশ্যই বাড়ানো দরকার। আর যে টাকা বরাদ্দ হয় তা খরচ করতে না পারা অবশ্যই ব্যর্থতা। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বিকেন্দ্রীকরণ এখনো হয়নি। মাঠপর্যায়ে স্থাপনা থাকলেও স্থানীয় ব্যবস্থাপকদের অনেক কিছুর জন্যই কেন্দ্রের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। জরুরি অনেক কাজ স্থানীয় ব্যবস্থাপকরা করতে পারেন না, তাদের সেই স্বাধীনতা নেই। ফলে অনেক সেবা বন্ধ থাকে।
স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয়হীনতা দূর করতে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। এ খাতের কেনাকাটায় গতিশীলতা আনতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা অডিট ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাদের কারণে বরাদ্দের অর্থ খরচ করা হয় না, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা রাখতে হবে। সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।