হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির আবদোল্লাহিয়ানসহ আটজন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ এসব নেতার মৃত্যুতে বিশ্বে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি দিয়েছে। এ দুর্ঘটনা ঘিরে নানা ধরনের আশঙ্কার কথা বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কেউ এটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছেন। কেউ আবার নাশকতার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সব মিলিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নিজেদের অভিমত জানিয়েছেন খবরের কাগজ পত্রিকায়। এ ছাড়া বিশ্বের কিছু প্রভাবশালী পত্রিকা এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপিয়েছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাইসির নিহতের ঘটনায় কিছু ইরানি ইসরায়েলকে সন্দেহ করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে ধারণা করছেন যে, এই দুর্ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে। দামেস্কে ইসরায়েল কর্তৃক একজন ইরানি জেনারেলকে হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।
ইরানের রাষ্ট্রয়ত্ত সংবাদমাধ্যম বলছে, ভারী বৃষ্টিপাত আর ঘন কুয়াশার কারণে হেলিকপ্টারের দৃষ্টিসীমায় ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে এই দুর্ঘটনায় শত্রুপক্ষের জড়িত থাকার আশঙ্কা নিয়ে জল্পনা ছড়িয়েছে। নাশকতা বা পরিকল্পিত হত্যার ক্ষেত্রে সন্দেহের তির সবার আগে যাচ্ছে ইসরায়েলের দিকে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা রাইসি নিহতের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
বিবিসির তথ্য বলছে, ইব্রাহিম রাইসিকে বহন করছিল বেল-২১২ মডেলের একটি হেলিকপ্টার। আর এই মডেলটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের এটি ইরানের কাছে বিক্রি করার কথা নয়। এই হিসাবে এই হেলিকপ্টারটি প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো। ইরানে এমন ঘটনা প্রথম নয়। এর আগেও আকাশপথে দুর্ঘটনায় বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। বিমান কিংবা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন সময় পরিবহনমন্ত্রী, রেভ্যুলেশনারি গার্ড এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা। এখানেও রয়ে গেছে একটা বড় ধোঁয়াশা। তাহলে কি প্রযুক্তিগত কারণেই এত বড় দুর্ঘটনা? নাকি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। এদিকে রাইসি নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি দেয়নি। ফলে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসি জনগণের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। তিনি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ইরান ছিল গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। সে সময় তিনি ইরানের হাল ধরেছেন। গত কয়েক বছরে আরও জোরদার করেছেন চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি। তিনি নতুন পরিবর্তন এনেছেন এ অঞ্চলে। ইরান খুব সুশৃঙ্খল একটি দেশ। দুর্ঘটনার পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্টকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মুরব্বিরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তাই ইরানের অভ্যন্তরেও উত্তেজনাকর কিছু হবে না। তবে ইব্রাহিম রাইসির অনুপস্থিতি ন্যূনতম হলেও ইরানের এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, নাশকতা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। তবে এখন পর্যন্ত ইরান থেকে সন্দেহ করার মতো এমন কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি। এ অবস্থায় উত্তেজনাকর কিছু হবে বলে মনে হয় না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটা নাশকতাও হতে পারে। প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারের সঙ্গে আরও দুটি হেলিকপ্টার ছিল নিরাপত্তার জন্য। তারা চেষ্টা করলে বাঁচাতেও পারত, কিন্তু তারা তা করেনি। তা ছাড়া আমেরিকা-ইসরায়েল বিশেষ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করে এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ইরানের গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন যে এটি নাশকতা, তাহলে তারা প্রতিশোধ নিতে চাইবেন। সেটি হলে এই অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে উত্তেজনা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে। এমনকি সেটি সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনিতেই ওই অঞ্চলে নানা সংঘাতপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। গাজা হত্যাকাণ্ড, হুতি বিদ্রোহীদের হামলা, হিজবুল্লাহ, হামাসের গেরিলা যুদ্ধ- তার ওপর এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে। আমরা আশা করছি, উত্তেজনা প্রশমনের জন্য সব পক্ষ ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।