সম্প্রতি দেশে আকস্মিকভাবে বেড়েছে অপরাধমূলক ঘটনা। লোভ-লালসা, নারী ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধসহ বিভিন্ন নৃশংস ঘটনা ঘটেই চলেছে। আকস্মিকভাবে পারিবারিক ও সামাজিক হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। এসব হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। তবে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়াটা সমাজের জন্য ভালো কোনো বার্তা নয়। এমনিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। তা ছাড়া অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও চোখে পড়ছে না। সবকিছু মিলিয়ে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এসব অপরাধ বাড়ছে পারিবারিক কলহের জেরে। সন্তান খুন করছে জন্মদাতা বাবাকে। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হচ্ছে অথবা স্ত্রীর হাতে স্বামী।
গত কয়েক দিনে এ ধরনের বেশ কিছু পারিবারিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এসব ঘটনা বৃদ্ধির জন্য কোনোভাবে দায়ী কি না, জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, এর কিছুটা প্রভাব হয়তো পড়ে। কিন্তু সেটিই প্রধান বা অন্যতম কারণ নয়। এর সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিকব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার অভাব, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, সাংসারিক অভাব-অনটনসহ নানা ধরনের বিষয় থেকে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে থাকে। সেখান থেকেই হিংস্রতা-নৃশংসতা বেশি ঘটে। হঠাৎ করেই মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটেছে। আর এই পরিবর্তন বেশির ভাগই নেতিবাচক। কামনা-বাসনা, চাহিদা অতিমাত্রায় পোষণ করছে মানুষ। এর সবকিছুই যে পূর্ণ হবে তা নয়। এর কোনোটির ব্যত্যয় দেখা দিলে ভয়ানক কোনো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে তারা। ইন্টারনেটভিত্তিক গেম আসক্তিতেও ভুগছে অনেকে। এটি ক্রমাগত অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত ২২ মার্চ রাতে চুয়াডাঙ্গায় নামাজরত বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করে ছেলে। কারণ, গেমে আসক্ত ছেলের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে। এ জাতীয় বেশ কিছু ঘটনা সম্প্রতি সমাজ ও পরিবারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, নানা পারিপার্শ্বিকতায় বর্তমানে সমাজ ও পরিবারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানুষের ধৈর্য কমে গেছে। মানবিক মূল্যবোধ কমে গেছে। অন্যদিকে বেড়েছে লোভ আর হিংসা। এসব কারণে একশ্রেণির মানুষ অনেক কিছুই সহজে মেনে নিতে পারেন না। ফলে ঘটছে হত্যার মতো নৃশংস সব ঘটনা। এ জাতীয় ঘটনা শুধু আইন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চাও খুব জরুরি।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিবার ও সমাজের দায় রয়েছে। ধর্মীয় নৈতিকতার শিক্ষা, সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সন্তানদের মানসিক বিকাশে কাউন্সেলিং করা জরুরি, যা উন্নত দেশগুলোতে হয়ে থাকে। সন্তানদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকতে হবে। সেই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক এমন নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে নৃশংসতা অনেকটাই কমে আসবে। সর্বোপরি নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়িয়ে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।