গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ ১৫ বছর পর পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক (এফওসি) অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব জসিম উদ্দিন এবং পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ। বৈঠকে বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর দ্রুত সমাধান করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্যে সব বিষয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈঠকটি।
কূটনৈতিক পর্যায়ে সাধারণত যেসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তার লক্ষ্য থাকে বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর দ্রুত সমাধান করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়া। এই বৈঠকটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে এই ভূখণ্ডের মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, এই ভূখণ্ড তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে ২৪ বছরের মাথায় ১৯৭১ সালে এই সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পৌঁছায়। একদিকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের মানুষের ওপর নির্মম নিপীড়ন, অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালায়; অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। এর সবই ইতিহাস। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৈরিতাই শেষ কথা নয়। পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগুলোকে চলতে হয়। বাংলাদেশও কূটনীতির এই ধারাতেই বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে। তবে একাত্তরে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তাতে দুই দেশের সম্পর্ক সহজ হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে কখনো তা সহজ হয়েছে, কখনো আবার থমকে গেছে; অস্বস্তির মাত্রাটাই ছিল বেশি। তবে এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ কথাই বলেছেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দুই পররাষ্ট্রসচিব। বাংলাদেশ পাকিস্তানকে জানিয়েছে, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হলে দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ১৪টি জেলায় আটকে পড়া ৩ লাখ ২৪ হাজার পাকিস্তানি নাগরিককে পাকিস্তানে ফেরত নেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। এ ছাড়া কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
দুই দেশের লেখক, ক্রীড়াবিদ, শিক্ষাবিদসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদলের যাতায়াত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আঞ্চলিক সংস্থা সার্ককে উজ্জীবিত করতে এবং ইসলামি দেশগুলোর সংগঠন ওআইসিতে উভয় দেশের সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয়েও একমত হয় দুই দেশ। এর সবই ছিল নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বৈঠকে বাংলাদেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছে। প্রথমত, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বলেছে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানকে বাংলাদেশের পাওনা পরিশোধ এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেছে।
বাংলাদেশের এই দাবি আজকের নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে এই দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ৫৪ বছরেও কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসেনি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে এখন যে পদক্ষেপ নিয়েছে, পাকিস্তানের তাতে সাড়া দেওয়া উচিত। শুধু সাড়া নয়, অবিলম্বে গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি যে নতুন ও অভূতপূর্ব তাও নয়। ইতোপূর্বে নিজেদের অপরাধের জন্য জাপানিরা চীন ও কোরিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। গণহত্যার বিষয়টি আসলে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতির গভীরে এমন ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে যে, পাকিস্তান ক্ষমা চাইলে বাংলাদেশের মানুষ মানসিকভাবে অনেক স্বস্তিবোধ করবে। এতে দুই দেশের সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় ও জনপরিসরে অনেক সহজ হয়ে আসবে। আমরা পাকিস্তানকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।