দেশের মৌলিক সেবা খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাস্থ্য খাত। দীর্ঘদিন রুগ্ণ ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এ খাতকে চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও সেবার মান খুবই অপ্রতুল। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ চিকিৎসকদের ঘাটতি অনেক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন খাতের মতো স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন করে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গত সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন মনে করে, এগুলো বাস্তবায়নে দুই বছর সময় লাগতে পারে। আর বাস্তবায়নে সরকারের আন্তমন্ত্রণালয়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রতিবেদন তৈরিতে কমিশন সদস্যদের ৫১টি নিয়মিত বৈঠক ও ৩২টি পরামর্শ সভা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে আটটি বিভাগে ৮ হাজার ২৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মতামত সংগ্রহ করা হয়। ৩৩২ পৃষ্ঠার বিশাল এ প্রতিবেদনে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারে বিপুলসংখ্যক সুপারিশ থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিষয়টি উপেক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রতিবেদনে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা বিষয়ে একাধিক সুপারিশ থাকলেও রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি সংস্কার কমিশনের সুপারিশে ১৯৭৮ সালের আলমাআটা সম্মেলনে স্বাস্থ্যকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার প্রতিফলন নেই। এখানে স্বাস্থ্যকে চিকিৎসায় আবদ্ধ করা হয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সবার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া অতিদরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের জন্য বিনামূল্যে সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, পুষ্টি ও জরুরি সেবায়। ওষুধ কোম্পানিগুলো যেন ডাক্তারদের উপহার দিতে না পারে, সে সুপারিশও করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। নাগরিক সংগঠন ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ বলেছে, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব সুপারিশ নিয়ে কোনো বিভেদ বা রাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ নেই, সেগুলোর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা যেতে পারে। ভঙ্গুর এ খাতের চিত্র পাল্টাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।
সেবার মানোন্নয়নে কার্যকর কমিউনিটি এডুকেশনও প্রয়োজন। সুপারিশগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটির জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সরকারের সদিচ্ছায় কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নযোগ্য সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমলে নিতে হবে। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। এটি অবশ্যই আশার কথা। স্বাস্থ্য খাতের এ ভগ্নদশায় সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন আশার সঞ্চার করেছে। এ খাতে সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে। আশা করছি, সরকার দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।