ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দেশ নিয়ে নতুন করে জন-আকাক্ষা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনও গঠন করে। এসব কমিশন ইতোমধ্যে তাদের সংস্কার প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। সংস্কার-প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে এবং ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম পর্যায়ের আলোচনাও হয়েছে। পাঁচটি সংস্কার কমিশনের অনেক সুপারিশ বা প্রস্তাবের বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও ক্ষমতার ভারসাম্যসহ মৌলিক প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। এসব কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও তৈরি করেছে। এখন সরকার সেগুলো চূড়ান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় আলোচনা চলতি মাসেই শুরু হবে বলে আশা করা যায়। নীতিগতভাবে একমত হওয়া বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ঐকমত্যের ভিত্তিতেই ‘জাতীয় সনদ’ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজেরও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। যেসব বিষয়ে মতভিন্নতা আছে, সেগুলো নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হবে। ছয় কমিশনের তৈরি সুপারিশগুলোকে দুভাগে বিভক্ত করা যায়। এর মধ্যে কিছু সুপারিশের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোনো দ্বিমত নেই এবং এগুলো অধ্যাদেশ হিসেবে বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি নেওয়া আবশ্যক। ৩৩টি রাজনৈতিক দল এবং জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম পর্যায়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। একটি সুষ্ঠু, সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে সুপারিশের বিষয়ে বেশ কিছু মতামত পাওয়া যায়। এসব সুপারিশের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বিষয়ে ভিন্নমত আসে। রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্নমতের বিষয়গুলোকে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে কমিশনকে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে বলে আশ্বস্ত করে। এনসিপি মৌলিক সংস্কারকে বেশি জোর দিচ্ছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করার প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় সব দলই একমত হয়েছে। তবে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিএনপির মতপার্থক্য একটু বেশি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে তাদের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি।
মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি। কমিশনের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির মতামতকে বিবেচনায় নিয়ে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো যেতে পারে। যেসব বিষয়ে ভিন্নমত তৈরি হবে, সে বিষয়গুলো অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রত্যাশা করছি, সরকার জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে অংশীজনদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ‘জাতীয় সনদ’ তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।